অনুসরণ করুন:
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

ভারতের তরুণদের ক্ষোভে নতুন রাজনৈতিক ঝড়, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ঘিরে তুমুল আলোড়ন

ভারতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা তরুণদের ক্ষোভ এখন নতুন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করেছে। চাকরির সংকট, ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ক্ষুব্ধ তরুণদের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যে সরকারের জবাবদিহিতা দাবি করছে। এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক কিন্তু দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা রাজনৈতিক আন্দোলন।

এই আন্দোলনের উদ্যোক্তা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী। গত শনিবার সকালে তিনি দিল্লিতে পৌঁছেছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে। বিমানবন্দরে নামার আগে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, তার বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা আশঙ্কা করছেন তাকে বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তবে তিনি আর ভয় পেতে রাজি নন। তার ভাষায়, “এই দেশ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নয়, এটি আমাদের সবার। আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তাই এখন কথা বলার সময় এসেছে।”

দিল্লি বিমানবন্দরে তার আগমনের সময় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবে পরে পুলিশ তাকে এবং তার সমর্থকদের রাজধানীর ঐতিহাসিক বিক্ষোভস্থল জন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেয়। আন্দোলনের উদ্যোক্তারা বলছেন, তাদের মূল দাবি হলো দেশের শিক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

বর্তমান ক্ষোভের অন্যতম বড় কারণ ভারতের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষায় ভর্তির জন্য অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। প্রতিবছর কোটি কোটি শিক্ষার্থী সীমিতসংখ্যক আসনের জন্য এসব পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিশেষ করে মেডিকেল ও প্রকৌশল শিক্ষায় ভর্তির পরীক্ষাগুলোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নফাঁস, দুর্নীতি, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করার পরও একটি অনিয়ম পুরো ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারে।

২৪ বছর বয়সী ভেরোনিকা মাদান, যিনি দুইবার ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, বলেন পরীক্ষার চাপ শুধু পরীক্ষার দিন নয়, বরং বহু বছর ধরে শিক্ষার্থীদের তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি বলেন, “সফল হতেই হবে—এই মানসিক চাপ, পরিবারকে হতাশ করার ভয় এবং নিজের কাছে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা আমাদের সবসময় ঘিরে রাখে।”

দুই বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পরও তিনি দেশের শীর্ষ মেডিকেল কলেজগুলোতে সুযোগ পাননি। বর্তমানে তিনি ফরেনসিক সায়েন্সে স্নাতকোত্তর করছেন। হতাশার সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, “এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক সময়। কিন্তু সেই ব্যর্থতাই আমাকে নতুন পথ খুঁজে নিতে বাধ্য করেছে।”

ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক তরুণদের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা চান, কিন্তু বারবার অনিয়ম তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

একই সময়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যও বিতর্ক সৃষ্টি করে। অনেকেই তার বক্তব্যকে বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা হিসেবে আখ্যায়িত করার সঙ্গে তুলনা করেন। যদিও পরে বিচারপতি ব্যাখ্যা দেন যে তিনি ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহারকারীদের প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং ‘ককরোচ’ শব্দটিই তরুণদের প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ব্যঙ্গাত্মক নাম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক প্রচারণার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই আন্দোলনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ককরোচ প্রতীকভিত্তিক মিম, ভিডিও এবং পোস্ট কয়েক দিনের মধ্যে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের দাবি, মাত্র এক সপ্তাহে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের জনপ্রিয়তা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে নয়; বরং এটি ভারতের তরুণদের বাস্তব হতাশা ও ক্ষোভের প্রতিফলন। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৩৬ কোটির বেশি। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের অভাবে ভুগছে।

আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ বছরের কম বয়সী স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। অন্যদিকে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ২০ শতাংশের কোনো চাকরি নেই। প্রতিবেদনে শিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের পর্যায়কে ভারতের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তরুণদের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অনেকেই মনে করছেন, সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বললেও সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ শিক্ষিত তরুণদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তনের নজির তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনাও ভারতের তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করেছে।

যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার গত এক দশকে ধারাবাহিক নির্বাচনী সাফল্য ধরে রেখেছে, তবুও তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

দিপকে বলেছেন, “পাঁচ বছর আগে সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা কঠিন ছিল। কিন্তু এখন মানুষ কথা বলতে শুরু করেছে।”

তিনি দাবি করেন, তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নয়, বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা। দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তিনি বলেন, “আমাদের আন্দোলন হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক। সময় এসেছে ক্ষমতাসীনদের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করার।”

ভারতের তরুণদের এই নতুন আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কতদূর এগোবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশটির বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে জমে থাকা হতাশা, ক্ষোভ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এখন আর শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই; তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন