৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন; ২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ।
মোংলা বন্দরকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এ বন্দরকে কেন্দ্র করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোরসহ আশপাশের অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পঞ্চগড় থেকে মোংলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ, বন্দরের সরবরাহব্যবস্থা ও পণ্য পরিবহন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে চায় সরকার।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাগেরহাটের মোংলায় ‘বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর
সরকারপ্রধানের উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি জানান, সকাল সোয়া ১১টায় প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন সরাসরি মোংলা বন্দরে যাতায়াত করতে পারবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে এবং সারাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বন্দরের গুরুত্ব
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা বন্দর জ্বালানি, সার, খাদ্যশস্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় পণ্য রপ্তানিতে পরিপূরক বন্দর হিসেবে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি বলেন, খান জাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন ও কার্যক্রম চালু করাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার, তরুণদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আস্থা এবং আঞ্চলিক সুষম উন্নয়নে টেকসই আর্থসামাজিক মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের সাফল্যে সেবার মান ও পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্দরসেবার মান কতটা উন্নত হলো, পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কতটা কমল, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল—এসব বিষয় দিয়েই প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশবান্ধব সেবা ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজের নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তার মানদণ্ড অনুসরণ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিপজ্জনক কার্যক্রম ব্যবস্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত জনবল ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য
দেশের অর্থনীতিকে ২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীজন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, সহজ সেবা প্রক্রিয়া, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে রূপান্তরের পরিকল্পনার একটি ধাপ। এ লক্ষ্য অর্জনে বন্দরের নাব্যতা, নৌ চ্যানেলের নির্ভরযোগ্যতা, জাহাজের নিরাপদ চলাচল এবং প্রতিযোগিতামূলক বন্দরসেবা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে মোংলা বন্দরকে আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি উপযুক্ত বাণিজ্যিক ও পরিচালনাগত শর্তে একে ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ
খুলনা অঞ্চলের শিল্পায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে গ্যাস সরবরাহের উপায় নিয়ে সরকার কাজ করছে। শিল্পে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, একসময় খুলনা অঞ্চলে অনেক মিল-কারখানা ছিল। হারিয়ে যাওয়া সেই শিল্প ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার।
চীনের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ
বাংলাদেশের অবকাঠামো ও বাণিজ্য উন্নয়নে অব্যাহত সহযোগিতার জন্য চীন সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি মোংলা বন্দরে একটি কাঠবাদাম গাছের চারা রোপণ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌ প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা এবং চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের চেয়ারম্যান দাই হেগেন।
এ সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

