৪৬১.৯৯ কোটি টাকার কাজ ৭৩ প্যাকেজে ভাগ করে এলটিএমে দেওয়ার পরিকল্পনায় আপত্তি; ৭০.৬ কোটি টাকার পরামর্শক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন নির্মাণকাজে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (এলটিএম) বাদ দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে (ওটিএম) কেনাকাটা করার নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ২১টি এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনায় গত ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় ৪৬১.৯৯ কোটি টাকার বিতরণ লাইন নির্মাণকাজ ৭৩টি প্যাকেজে ভাগ করে এলটিএম পদ্ধতিতে ঠিকাদার নিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল আরইবি।
বড় কাজ ছোট প্যাকেজে ভাগ করা নিয়ে আপত্তি
প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনার সময় পরিকল্পনা কমিশন ও সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) বড় কাজকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্যাকেজে ভাগ করে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে আপত্তি জানায়। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারি ক্রয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আরইবির বিভিন্ন ক্রয়কাজে একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছিল। একটি কাজকে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ বণ্টন করা হলে দরপত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আরইবি ঠিকাদারদের একটি গোষ্ঠী তৈরি করেছে। এলটিএমের মধ্যে সবাইকে কাজ দিচ্ছে। এতে প্রতিযোগিতা থাকে না। আবার অদক্ষ ঠিকাদারদেরও কাজ দেওয়া হয়, যে কারণে কোনো কোনো প্যাকেজের কাজের মান বজায় থাকে না।’
ওই কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেন, কিছু ঠিকাদার কাজ পাওয়ার পর তা অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ উন্নয়ন বোর্ডও একই ধরনের কাজে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি ব্যবহার করে।
এলটিএমে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজের সুযোগ
একজন ক্রয় বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-কে বলেন, সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী একটি বড় কাজকে ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে এলটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা যায় না।
ওই বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় বিধিমালায় সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের কাজ এলটিএম পদ্ধতিতে দেওয়ার সুযোগ থাকায় কিছু ক্রয়কারী সংস্থা প্যাকেজ ভাগ করতে উৎসাহী হয়।
তবে এভাবে কাজ ভাগ করলে ক্রয়প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় তৈরি হয়। প্রতিটি প্যাকেজের জন্য আলাদা ক্রয়সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত, দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন করতে হয়। পাশাপাশি প্রতিটি প্যাকেজের ঠিকাদারকে মুনাফা দিতে হয়, যা সামগ্রিক ব্যয় বাড়াতে পারে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য টিবিএস আরইবির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ক্রয় বিধিমালায় প্যাকেজ ভাগের শর্ত
সরকারি ক্রয় বিধিমালার ২৫(৮) উপবিধি অনুযায়ী, কোনো ক্রয়চাহিদাকে ছোট ছোট প্যাকেজ বা লটে ভাগ করা কিংবা একাধিক প্যাকেজ একত্র করে বড় প্যাকেজ তৈরির ক্ষেত্রে বাজারের সক্ষমতা, সম্ভাব্য প্রতিযোগিতা এবং কাজ বাস্তবায়নের সুবিধা বিবেচনায় নিতে হবে।
একাধিক প্যাকেজে ভাগ করার আগে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রস্তাবিত আকারের কাজের জন্য গ্রহণযোগ্য দরপত্র জমা দেওয়ার মতো সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
অন্যদিকে, বিধিমালার ২৫(৬) উপবিধি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এড়াতে কোনো প্রকল্প বা ক্রয়চাহিদাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কম মূল্যমানের একাধিক প্যাকেজে ভাগ করা যাবে না।
অর্থাৎ, যুক্তিসংগতভাবে একটি প্যাকেজে সম্পন্ন করা সম্ভব—এমন কাজকে শুধু প্রাক্কলিত মূল্য কমিয়ে অপেক্ষাকৃত কম কঠোর ক্রয়পদ্ধতির সুবিধা নেওয়ার জন্য ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করা নিষিদ্ধ।
প্যাকেজ ভাগ নিয়ে ভিন্নমত সাবেক সিপিটিইউ মহাপরিচালকের
সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সাবেক মহাপরিচালক মো. ফারুক হোসেন বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, কাজ বাস্তবায়নের সুবিধা কিংবা ঠিকাদারদের সক্ষমতার মতো গ্রহণযোগ্য কারণ থাকলে একটি কাজকে একাধিক প্যাকেজে ভাগ করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি প্যাকেজের মূল্য নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকলে এলটিএম ব্যবহার করাও আইনগতভাবে বৈধ হতে পারে।’
ফারুক হোসেন আরও বলেন, ক্রয় পরিকল্পনা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) অংশ হলেও কোন ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, তা নির্ধারণ করে দেওয়ার এখতিয়ার পরিকল্পনা কমিশনের নেই।
তাঁর মতে, প্রকল্প প্রস্তাবকারীদের জমা দেওয়া ক্রয় পরিকল্পনা নিয়ে কমিশন আলোচনা করতে পারে বা আপত্তি তুলতে পারে। তবে ক্রয়পদ্ধতি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া কমিশনের এখতিয়ারের বাইরে।
৭০.৬ কোটি টাকার পরামর্শক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন
প্রকল্পের উপকেন্দ্র ও বিতরণ লাইন স্থাপনের মতো নিয়মিত কাজের জন্য পরামর্শক সেবা বাবদ ৭০.৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) নুরুন্নাহার চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় বলা হয়, এ ধরনের সাধারণ কাজের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ে পরামর্শক নিয়োগের যৌক্তিকতা নেই।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আরইবির নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে এ ধরনের পরামর্শক ব্যয় পরিহার করতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে পরামর্শক নিয়োগ একান্ত প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট জনমাস ও সম্মানীর ভিত্তিতে ব্যয় সীমিত রাখতে হবে।
এ ছাড়া প্রতি কিলোমিটার হিসাবে ঢালাওভাবে কিংবা থোক বরাদ্দের ভিত্তিতে পরামর্শক ব্যয় নির্ধারণ করা যাবে না বলে সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়।

