বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

পাঁচ মাসে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন বিএসইসির

বন্ড বাজার সম্প্রসারণে সংস্কার, মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির শর্ত

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পথ সম্প্রসারণে গত পাঁচ মাসে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশনের বর্তমান নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুমোদিত এসব বন্ডের মাধ্যমে করপোরেট অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি শেয়ারবাজারের বাইরে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্ড বাজারকে আরও গতিশীল করতে তালিকাভুক্তি, লেনদেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ এবং বিধিমালা সংস্কারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

অনুমোদন পেয়েছে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের বন্ড

বিএসইসির অনুমোদিত বন্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন গ্রিন বন্ড, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, ব্যাংক এশিয়ার ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাসটেইনেবল সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং ওয়ান ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড।

এসব বন্ডের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ পণ্য যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির শর্ত

বন্ড বাজারের পরিধি বাড়াতে অনুমোদিত বন্ডগুলো স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত করার শর্ত দিয়েছে বিএসইসি। এর উদ্দেশ্য করপোরেট বন্ডের দ্বিতীয় বাজারে লেনদেন বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য কেনাবেচার সুযোগ সম্প্রসারণ করা।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, বন্ড বাজারকে গতিশীল করতে এবারই প্রথম মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বন্ডগুলো স্টক এক্সচেঞ্জের দ্বিতীয় বাজারে লেনদেনের সুযোগ পাবে। এ জন্য তালিকাভুক্তি ফি কমানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বন্ড মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী তা বিক্রি করে সহজে বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। এতে বন্ডের কার্যকর বাজার গড়ে তোলা এবং লেনদেন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

নারী ক্ষমতায়ন ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে বন্ড

শেয়ার ও প্রচলিত বন্ডের বাইরে নতুন ধরনের বিনিয়োগ পণ্য যুক্ত করতেও কাজ করছে বিএসইসি। পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে থিমেটিক ও সামাজিক বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে নারী ক্ষমতায়নে অর্থায়নের জন্য সাজেদা ফাউন্ডেশনের ১৫৮ কোটি টাকার ‘অরেঞ্জ বন্ড’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ বন্ডের মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অর্থায়নের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ পণ্য যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ড পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগে অর্থায়ন এবং টিয়ার-২ মূলধন সংগ্রহে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে করপোরেট বন্ডের ধরন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ

বন্ড বাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসইসি। বিশেষ করে প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অর্থ করপোরেট বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।

বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অর্থের বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়। এসব তহবিলের অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ যাতে করপোরেট বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগ করা যায়, সে জন্য নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।

তিনি বলেন, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থের নতুন উৎস তৈরি হবে। একই সঙ্গে করপোরেট বন্ডের চাহিদা বাড়বে এবং বেসরকারি খাতের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।

এ ছাড়া বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের অংশগ্রহণ বাড়াতেও কাজ করছে কমিশন। বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ডের নির্দিষ্ট আয়ভিত্তিক তহবিল এবং বীমা কোম্পানির তহবিল যাতে করপোরেট বন্ডে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

লেনদেন প্ল্যাটফর্ম ও বিধিমালা সংস্কার

বন্ড কেনাবেচার জন্য পৃথক লেনদেন প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে বিএসইসির। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বন্ড কেনাবেচার সুযোগ বাড়ানো এবং দ্বিতীয় বাজারে লেনদেন সম্প্রসারণের পথ সুগম করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বন্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া সহজ ও সময়োপযোগী করতে বিদ্যমান আইনি কাঠামো আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ডেট ইস্যু রুলস সংশোধন ও সংস্কারের কাজ চলছে।

নতুন বিধিমালায় বন্ড অনুমোদন ও ইস্যুর প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শেয়ারনির্ভরতা কমিয়ে বহুমাত্রিক বাজার গড়ার লক্ষ্য

বিএসইসি মনে করে, পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ারনির্ভর না রেখে শেয়ার, বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক পণ্যের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক বাজার হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই করপোরেট বন্ড বাজারের বিকাশকে সংস্কার কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের পাশাপাশি তুলনামূলক স্থির আয়ের বিনিয়োগ পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। বন্ডের দ্বিতীয় বাজার সক্রিয় হলে পুঁজিবাজারে লেনদেনের পরিধি ও বাজারের গভীরতা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন