খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আনন্দময় শিখন ও কারিগরি দক্ষতায় গুরুত্ব; ২৫ অক্টোবর অনুমোদনের পর দেড় কোটি কপি মুদ্রণের পরিকল্পনা
শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নীতি-নৈতিকতা, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন চারটি পাঠ্যবই প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বইগুলো হলো—চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, গবেষণা ও নির্দেশনার আলোকে বইগুলো শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, “রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সংস্কারে মনোনিবেশ করেন।”
তিনি বলেন, “শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে দীর্ঘ বছর উনি (প্রধানমন্ত্রী) কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যে চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণা পরিচালনা করেছেন—তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে নতুন এই বইগুলো।”
মাহ্দী আমিন আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গত ১৫ বছর এ বিষয়ে আমি নিজে কাজ করে যেটা বুঝেছি—উনি চান শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরি হবে।”
তিনি জানান, শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এনসিটিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ জন্য একটি দল গঠন করা হয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবিদদের যুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা ধারাবাহিক আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন।
অনুমোদনের অপেক্ষায় চার বই
এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতানির্ভর পাঠ্যপুস্তকগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে বলেন, “নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও ভ্যালিডেশন কাজ ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই কন্টেন্টগুলো মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে।”
এনসিটিবি জানায়, চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থাটির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু বাসসকে বলেন, নতুন চারটি বই মুদ্রণের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির অনুমোদনের পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই মুদ্রণের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।
খেলাধুলা: সুস্থ জীবনধারা ও আত্মরক্ষার কৌশল
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনায় ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে ‘খেলাধুলা’ বইটি। শিশুদের শৈশব থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়ম সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খেলার মাঠে বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয় বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার ও আঘাত প্রতিরোধের কৌশলও হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থাকবে। খেলাধুলার পাশাপাশি পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশ ছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রাখা হয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তাঁর সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার কাহিনির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, খেলাধুলা কীভাবে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি পেশা হিসেবে আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, “শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়ে ওঠে, সেদিকে বিশেষ নজর রেখে ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রথমবারের মতো প্রণয়ন করা হয়েছে।”
বাংলাদেশের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও নতুন কুঁড়ি
দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করতে ১১টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি।
এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বর্ণিল চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটিতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও পিঠা-পুলির মেলবন্ধনের পাশাপাশি বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গৃহস্থালির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার আধুনিক রূপ তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: ভীতিহীন ও আনন্দময় শিখন
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলাই এর মূল দর্শন।
প্রচলিত পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভরতার বাইরে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাঠ্যভার কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শিখনফল অর্জনে সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে—শেখা শুধু মুখস্থ করা বা পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয় নয়; নিজের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও জ্ঞান অর্জন সম্ভব।
আমার কারিগরি শিক্ষা: ছোট উদ্যোগ, বড় সম্ভাবনা
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস ও সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে তুলতে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি আটটি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কী করতে পারে, সে বিষয়ে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলাই বইটির মূল লক্ষ্য।
কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের সম্ভাবনা, উদ্ভাবন ও নির্মাণ, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই জীবনযাপনসহ বিভিন্ন বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাস্তব জীবনের কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়ক ব্যবহারের মাধ্যমে মৌলিক সমাধান খুঁজে বের করার ভিত্তি তৈরি করবে বইটি। নতুন চারটি বইয়েই শব্দকোষের মতো বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে আরও শ্রেণিতে সম্প্রসারণ
উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি চালু করা হবে। পরবর্তী সময়ে এগুলো প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও কারিগরি শিক্ষা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শওকত আলী খান বাসসকে বলেন, “নতুন এই চারটি পাঠ্যপুস্তক প্রবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

