চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পদ থেকে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণের পর প্রায় এক মাস ধরে অচলাবস্থা চলছে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ আন্দোলন করছেন। তাঁদের দাবি, অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করতে হবে।
আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা শাটডাউনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পেরে অনলাইনে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে এ পরিস্থিতি চললেও সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা বিবৃতি পাওয়া যায়নি। শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টার পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য আসেনি।
সর্বশেষ গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) অচলাবস্থা নিরসনে সুপারিশ দিতে ছয় সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এর আগে রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পর কমিটি গঠন করে কমিশন।
চলতি বছরের ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। তবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় তাঁকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
গত ২১ সেপ্টেম্বর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নতুন উপাচার্য নিয়োগের খবর পেয়ে সেদিন রাতেই ক্যাম্পাসে আন্দোলন শুরু করেন একদল শিক্ষার্থী। পরদিন সকাল থেকে তাঁরা লাগাতার শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন। পরে আন্দোলনে যুক্ত হন শিক্ষকদের একটি অংশ। ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েট শিক্ষক সমিতি সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু করে। সমিতির সাধারণ সভায় নেওয়া এ কর্মসূচি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালন করা একজন উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে কেন আন্দোলন করছেন, জানতে চাইলে আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উপাচার্য হওয়ার অনেক আগে, ২০০৫ সালে চুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করার পর থেকেই অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করেছেন।
ওই শিক্ষার্থী বলেন, উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের কাছে এমন একজন প্রশাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন, যিনি তাঁদের সমস্যার কথা শুনতেন এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতেন।
চুয়েটের শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা, বৃত্তি ও চাকরির সুযোগ পান, সে লক্ষ্যেও অধ্যাপক সায়েম বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরেক শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তির সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাকরির ক্ষেত্র তৈরির প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন অধ্যাপক সায়েম।
তাঁর ভাষ্য, এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের কাছে কেবল প্রতিশ্রুতি ছিল না। অধ্যাপক সায়েমের আগের কাজের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় এগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মতো অধ্যাপক সায়েমের নেতৃত্বের বিষয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. মইনুল ইসলাম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, অধ্যাপক সায়েম যেভাবে কাজ শুরু করেছিলেন এবং অল্প সময়ে যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও মনে করেছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে চুয়েট কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
অধ্যাপক মইনুল ইসলামের মতে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও যোগাযোগ গড়ে তোলার সক্ষমতা অধ্যাপক সায়েমের ছিল।
অধ্যাপক সায়েমকে কেন উপাচার্য পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আন্দোলনরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ মনে করছেন, তাঁর অপসারণের পেছনে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে টানাপড়েন থাকতে পারে।
এমন ধারণার পেছনে চুয়েটের ওয়েবসাইটের ‘একাডেমিক নিউজ’ বিভাগে প্রকাশিত দুটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কথা সামনে আনছেন কেউ কেউ।
গত ২৫ আগস্ট প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের সঙ্গে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের সাক্ষাতের তথ্য দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সেদিন ঢাকায় প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন অধ্যাপক সায়েম।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উপাচার্য চুয়েটের সার্বিক পরিস্থিতি প্রতিমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে তাঁর সহযোগিতা কামনা করেন। প্রতিমন্ত্রী চুয়েটের অধিকতর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কামনা করেন এবং সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এরপর ৩০ আগস্ট চুয়েটের ২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে ১ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থিত থাকার কথা জানানো হয়েছিল।
১ সেপ্টেম্বরের ওই অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। এর ২১ দিন পর ঢাকায় অবস্থানকালে উপাচার্যের পদ হারান অধ্যাপক সায়েম।
তবে এসব ঘটনার সঙ্গে উপাচার্য অপসারণের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও অপসারণের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি।
চুয়েটের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন কি না, জানতে চাইলে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ পরিস্থিতি নিরসন করা শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় প্রশাসনের বিষয়।
তিনি বলেন, চুয়েটে কী কারণে আন্দোলন হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট নয়। এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তখন এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
সংকট নিরসনে কোনো পক্ষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কি না, জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নেবে। তাঁর সঙ্গে কারও যোগাযোগ হয়নি। বিষয়টি তাঁর দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে না বলে জানান তিনি।
আন্দোলন অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘদিন ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে টার্ম শেষ না হলে সেশনজটের সৃষ্টি হতে পারে বলে উদ্বিগ্ন তাঁরা।
আন্দোলনরত এক ছাত্রী বলেন, চুয়েটের প্রায় সব শিক্ষার্থী একটি দাবিতে আন্দোলন করছেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য অপসারণের দাবিতে আন্দোলন হলেও চুয়েটে পরিস্থিতি উল্টো। ভালো একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তাঁরা অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছেন।
তিনি বলেন, সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষায় ফিরতে চান। আর দেরি না করে সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যাতে তাঁরা আবার নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরতে পারেন।
এ বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, চুয়েটে বছরে দুটি টার্ম হয়। প্রথম টার্মের পর এক সপ্তাহ এবং দ্বিতীয় টার্মের পর তিন সপ্তাহ ছুটি থাকে। শিক্ষার্থীরা সম্মত হলে টার্ম শেষে নির্ধারিত ছুটিগুলো কমিয়ে বা বাদ দিয়ে ইতোমধ্যে সৃষ্ট সময়ের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সামিউন বাসির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর তাঁরা ঢাকায় গিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।
তিনি বলেন, এর আগে তাঁরা লিখিতভাবে তাঁদের দাবি জানিয়েছিলেন। সেদিন মৌখিকভাবেও দাবির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন। তাঁদের দাবি, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করতে হবে।
সামিউন বাসির বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের বক্তব্য শুনেছেন এবং পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে জানিয়েছিলেন। এখন তাঁরা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের সঙ্গে শিক্ষক সমিতির কোনো যোগাযোগ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁরা নিজেরা কোনো যোগাযোগ করেননি।
সরকারের পক্ষ থেকে শিগগির কোনো সিদ্ধান্ত না এলে শিক্ষক সমিতি সাধারণ সভা করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করবে বলে জানান তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান সামিউন বাসির।
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য জানতে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে গত কয়েক দিনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপেও প্রশ্ন পাঠিয়ে তাঁর বক্তব্য চাওয়া হয়, তবে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পেরে অনলাইনে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক সায়েমকে কেন সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একইভাবে প্রায় এক মাস ধরে চলা আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনেও সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
সরকারের নীরবতার কারণ জানতে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে একাধিকবার ফোন করা হয়। প্রথমবার ফোন ধরে ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে আর ফোন ধরেননি।
এ বিষয়ে কথা বলতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি দেশের বাইরে থাকার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
ফলে চুয়েটের অচলাবস্থা কবে কাটবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কবে ক্লাস ও পরীক্ষায় ফিরতে পারবেন এবং উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

