ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জীবনবৃত্তান্তে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ; দাবি অস্বীকার করে আসছেন সায়মা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জীবনবৃত্তান্তে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রোববার দুদকের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তদন্তে দেখা গেছে, সায়মা ওয়াজেদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ‘অনারারি স্পেশালিস্ট বা এক্সপার্ট’ হিসেবে কাজ করার যে তথ্য জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছিলেন, তার পক্ষে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
দুদক সচিব বলেন, “আমরা তথ্য সংগ্রহ করেছি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে। সেখান থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে ওখানে তিনি এরকম কোনো পদে ছিলেন না বা এরকম কোনো দায়িত্ব উনি পালন করেননি।”
জীবনবৃত্তান্তে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ
দুদকের অভিযোগ, বিএসএমএমইউতে সম্মানসূচক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার তথ্য জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছিলেন সায়মা ওয়াজেদ। তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্যকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের দাবি, অটিজম ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করা এবং এ-সংক্রান্ত পাঠ্যক্রম তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য সায়মার যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, “মিথ্যা তথ্য সিভিতে উনি উল্লেখ করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে যে তিনি সাবেক বিএসএমএমইউ-তে অনারারি এক্সপার্ট হিসেবে উনি কাজ করেছেন। এরকম তথ্য দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে উনি এই পদ লাভ করেন।”
সম্মানসূচক পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদক সচিব বলেন, “অফিসিয়াল ফাইলে তো থাকতে হবে।”
মামলায় যুক্ত হচ্ছে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা
ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় সুনাম ক্ষুণ্ন করার মাধ্যমে অপরাধমূলক অসদাচরণের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২০ মার্চ সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
মামলায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা প্রয়োগ করা হয়। তদন্ত শেষে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা যুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
মামলাটির তদন্ত করেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের মানিলন্ডারিং-১ শাখার উপপরিচালক তাহাসিন মুনাবীল হক।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদ সূচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন হিসেবে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন নেন। এ সময় তিনি বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেওয়ার সম্মতি দিয়েছিলেন। তিনি অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যাবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসনের দায়িত্বও পালন করেন।
এসব দায়িত্বে থাকাকালে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন তিনি।
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সায়মা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কোনো নথি না খুলে এবং তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না দিয়ে চাপ প্রয়োগ করেন। পরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের মাধ্যমে তার জীবনবৃত্তান্ত ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। দুদকের দাবি, এসব তথ্য ব্যবহার করেই তিনি ওই পদে নিয়োগ পান।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। এর আগে বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
ডব্লিউএইচওর পদ থেকে পদত্যাগ
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের জন্য তিনি ওই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে শেখ হাসিনার পাশাপাশি সায়মা ওয়াজেদকেও কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় আসামি করা হয়।
জালিয়াতির অভিযোগে তদন্ত চলাকালে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। পরে ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।
২০২৬ সালের ৩ জুলাই সায়মার আইনজীবীদের দেওয়া একটি চিঠির তথ্য অনুযায়ী, ডব্লিউএইচও তার বিরুদ্ধে চীন সফরে আর্থিক জালিয়াতি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল। তবে এসব অভিযোগও অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
এদিকে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্লট দুর্নীতির অভিযোগে করা একটি মামলায় ঢাকার একটি আদালত সায়মা ওয়াজেদকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। এর আগে তাকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির আদেশ দিয়েছিলেন ঢাকার আদালত।
পরিবারের সদস্যদের দেশে ফেরাতে বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগ
সায়মার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়ার অনুমোদনের পর তাকে এবং শেখ হাসিনার পরিবারের অন্য সদস্যদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদক সচিব বলেন, এ বিষয়ে একাধিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “আপনারা নিশ্চয় জানেন যে শুধু দুদক কাজ করছে না, এর সাথে অন্যান্য সংস্থাও জড়িত রয়েছে। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আমরা একযোগে কাজ করছি তাদেরকে ফেরত আনার জন্য। যখন যেটি করা দরকার, যে সমস্ত তথ্য চাওয়া হচ্ছে, আমরা সেগুলো সরবরাহ করছি।”
এ বিষয়ে কোনো দেশ থেকে সাড়া পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে শিগগিরই ইতিবাচক অগ্রগতি বা ভালো সংবাদ পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী দুদক।
কোন কোন দেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব দোহা, কাতার, জেনেভা ও সুইজারল্যান্ডে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যালয়ে পাওয়া তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে চিঠি পাঠানোর কথা জানান।

