বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

ইয়েমেন সংঘাতে নতুন উদ্বেগ, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা হুথিদের

১,৯০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করলে সৌদি আরব ও ইসরায়েল হুথিদের সরাসরি হামলার আওতায় আসতে পারে

চীন থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ইরানের তৈরি ‘খেবার শেকান’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নিজস্ব সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের (সিএআর) নতুন তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথিদের তৈরি সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার হতে পারে। এ ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সক্ষম হলে সৌদি আরবের পুরো ভূখণ্ড এবং ইসরায়েল হুথিদের সরাসরি হামলার আওতায় চলে আসতে পারে।

তবে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কার্যক্রম কতটা এগিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, যন্ত্রাংশ আমদানির তথ্য থেকে উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বোঝা গেলেও, প্রকল্পটি সফলভাবে এগোচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

জব্দ করা চালানের তথ্য থেকে নতুন বিশ্লেষণ

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দুটি নির্দিষ্ট চালানের গোপন মালামাল জব্দ করার পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিএআর তাদের বিশ্লেষণ তৈরি করেছে। সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম গোপনে আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সিএআরের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিন্টজ সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, এ ধরনের যন্ত্রাংশ আমদানির অর্থ হতে পারে, হুথিরা ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে অথবা সে চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে উৎপাদন কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি সফল না-ও হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, হুথিদের অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ছদ্মবেশে রাখা হয়েছে। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অগ্রগতি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।

উদ্ধার হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিশেষ সরঞ্জাম

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি করা উপকরণের মধ্যে কাস্টম-মেড ধাতব যন্ত্রাংশ ছিল। এগুলোর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিনের কিছু অংশ এবং মূল কাঠামো বা এয়ারফ্রেম তৈরির উপাদান অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এ ছাড়া ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্রের উড্ডয়নকালে ভারসাম্য রক্ষাকারী ফিন বা পাখনা এবং খেবার শেকান সিরিজের সলিড-প্রোপেল্যান্ট রকেট মোটরের কিছু অংশ উদ্ধার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কিছু বিশেষ যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার সরঞ্জাম ও কাঁচামালও জব্দ করা হয়েছে। এসব কাঁচামালের মধ্যে ছিল ‘অ্যাবলেটিভ ম্যাটেরিয়াল’, যা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও গতিলাভের সময় সৃষ্ট প্রচণ্ড তাপ থেকে এর বিভিন্ন অংশকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমদানি করা কিছু উপকরণের বেসামরিক ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, কয়েকটি সরঞ্জাম বিশেষভাবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। অন্যদিকে, চীন সরকার জানিয়েছে, তারা হুথিদের ওপর আরোপিত জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলছে।

খেবার শেকানের সামরিক গুরুত্ব

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গত জুলাইয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্ষেত্রে ইরান ‘খেবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। সাশ্রয়ী, সহজে স্থানান্তরযোগ্য এবং নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা অন্তত ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠিন জ্বালানিচালিত মধ্যম পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের পুরোনো মডেলের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর তুলনায় আলাদা। পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে উৎক্ষেপণের আগে জ্বালানি ভরতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতো। কিন্তু খেবার শেকানে আগে থেকেই জ্বালানি ভরা থাকে। ফলে এগুলো দ্রুত ট্রাক বা অন্য যানবাহনে বহন করে উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা যায়।

এ ধরনের সক্ষমতা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিশীলতা বাড়ায় এবং উৎক্ষেপণকেন্দ্র শনাক্ত ও ধ্বংস করার জন্য প্রস্তুত থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে এড়িয়ে দ্রুত হামলা চালানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ইয়েমেন সংঘাতে আঞ্চলিক উত্তেজনা

হুথিদের ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও গোষ্ঠীটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তা সত্ত্বেও হুথিরা ইয়েমেনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ২০১৪ সাল থেকে দেশটির গৃহযুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইয়েমেনেও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের আঞ্চলিক প্রভাব বা ‘স্পিলওভার’ হিসেবে ইয়েমেনের পরিস্থিতিও আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

এদিকে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রোববার এক বিবৃতিতে এ প্রস্তাবের কথা জানান। পরে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রস্তাবটি পুনর্ব্যক্ত করে।

হুথিরা যদি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিজস্ব সংস্করণ তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে, তাহলে তা ইয়েমেন সংঘাতের সামরিক সক্ষমতার ভারসাম্য এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ মুহূর্তে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন