অন্য গ্রহের পৃষ্ঠে রোভার চালনায় নতুন মাইলফলক, ২০৩০-এর দশকেও সচল থাকার সম্ভাবনা; প্রাচীন প্রাণের চিহ্ন খুঁজে চলছে অনুসন্ধান
মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে ৪৫ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে রোবোটিক রোভার চালনার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তৈরি পার্সিভ্যারেন্স। ২০২১ সালে মঙ্গলে অবতরণের পর থেকে দীর্ঘ অভিযানে এ মাইলফলক অর্জন করেছে ছয় চাকার যানটি। এর মধ্য দিয়ে মঙ্গলের বুকে নাসার আরেক রোভার অপারচুনিটির গড়া আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে এটি।
মঙ্গলবার নাসা এ তথ্য জানিয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গলে অতীতে অণুজীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের লক্ষ্যে পরিচালিত এই অভিযানে রোভারটি বিভিন্ন প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করেছে।
অপারচুনিটির রেকর্ড ভাঙল পার্সিভ্যারেন্স
এর আগে ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মঙ্গলের পৃষ্ঠে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রেকর্ড গড়েছিল নাসার রোভার অপারচুনিটি। পার্সিভ্যারেন্স সেই দূরত্ব অতিক্রম করে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। দুটি রোভারের অতিক্রান্ত দূরত্ব চাঁদের পৃষ্ঠে চালিত যেকোনো লুনার রোভারের পাড়ি দেওয়া দূরত্বের চেয়েও বেশি।
পার্সিভ্যারেন্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক স্টিভেন লি বলেন, রোভারটির অভ্যন্তরীণ যন্ত্রপাতি ও প্রকৌশল ব্যবস্থাগুলো এখনো চমৎকারভাবে কাজ করছে। এর বিকল্প ও জরুরি সুরক্ষাব্যবস্থাগুলোও সচল রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির এই কর্মকর্তা বলেন, সর্বশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, রোভারটির সব ব্যবস্থা ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত বা তার পরেও কার্যকর থাকার সক্ষমতা রাখে।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে এগিয়ে পার্সিভ্যারেন্স
পার্সিভ্যারেন্সের এই সাফল্যের অন্যতম কারণ এর উন্নত স্বয়ংক্রিয় চলাচলব্যবস্থা। নাসার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘অটোনেভ’ নামের নেভিগেশন প্রযুক্তির সাহায্যে রোভারটি গবেষকদের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই প্রায় ৯০ শতাংশ পথ অতিক্রম করতে সক্ষম।
এই ব্যবস্থায় রোভারটির সামনের ভূখণ্ডের স্টেরিও ছবি বিশ্লেষণ করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়। এরপর সম্ভাব্য বাধা এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিরাপদ পথ নিজেই নির্বাচন করে যানটি।
এ ছাড়া ‘ভিশন কম্পিউট এলিমেন্ট’ নামের দ্রুতগতির প্রসেসর ছবি বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলের সফটওয়্যার পরিচালনায় সহায়তা করে। ফলে আগের প্রজন্মের রোভারগুলোর মতো প্রতিটি ধাপে থেমে পরবর্তী পথ নির্ধারণের প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে।
স্টিভেন লি বলেন, সোঝোর্নার, স্পিরিট, অপারচুনিটি ও কিউরিওসিটি—আগের চারটি মঙ্গল রোভারের প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পার্সিভ্যারেন্সের চলাচলব্যবস্থা আরও উন্নত করা হয়েছে।
১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার লক্ষ্য
পার্সিভ্যারেন্সের চলাচলব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করে দেখছেন নাসার প্রকৌশলীরা। তাদের লক্ষ্য, রোভারটি যেন অন্তত ১০০ কিলোমিটার বা তারও বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে। এ উদ্দেশ্যে যানটির হার্ডওয়্যার ১৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলাচলের উপযোগী কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
রোভারটির প্রাথমিক অভিযানে মাত্র ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের পরিকল্পনা ছিল। তবে এর কার্যকারিতা ও বৈজ্ঞানিক সাফল্যের কারণে নাসা সম্প্রতি ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ জেজেরো ক্রেটারে অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার জন্য মূল মিশনের মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে।
রোভারটিতে ব্যবহৃত প্লুটোনিয়ামভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থাও প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে। স্টিভেন লির ভাষ্য অনুযায়ী, এতে আরও বহু বছর শক্তি সরবরাহের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে।
প্রাচীন প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্নের সন্ধান
পার্সিভ্যারেন্সের প্রধান বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য মঙ্গলে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, তার সম্ভাব্য প্রমাণ খুঁজে বের করা। এ উদ্দেশ্যে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত জেজেরো ক্রেটারে গবেষণা চালাচ্ছে রোভারটি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, শত কোটি বছর আগে অঞ্চলটি পানিতে প্লাবিত ছিল এবং সেখানে একটি বড় হ্রদ ও তার অববাহিকা ছিল।
স্টিভেন লি বলেন, রোভারটির এ যাবৎকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাফল্য হলো প্রাচীন অণুজীবের সম্ভাব্য জীবাশ্ম বা প্রাণের অস্তিত্ব নির্দেশ করতে পারে—এমন জৈব-ভূতাত্ত্বিক আলামত শনাক্ত করা। গত বছর এ সম্ভাব্য আলামত প্রকাশ্যে আসে।
জেজেরো ক্রেটারের প্রাচীন হ্রদের কাছে প্রায় ৩২০ কোটি থেকে ৩৮০ কোটি বছর আগে গঠিত লালচে শিলায় এসব সম্ভাব্য চিহ্নের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এ ধরনের আলামতকে অতীতের প্রাণের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মঙ্গলের প্রাচীন পরিবেশ সম্পর্কে নতুন তথ্য
বর্তমানে পার্সিভ্যারেন্স জেজেরো ক্রেটারের পশ্চিম প্রান্তের ‘লাক দ্য চার্মস’ নামে পরিচিত একটি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ‘ইদুবি’ এলাকার দিকে এগোচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে মঙ্গলের প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস এবং বড় উল্কাপাতের প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এমন একটি বৃহৎ উল্কাপাতের ফলেই জেজেরো ক্রেটার তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
মহাকাশ থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকেরা আরও মনে করছেন, ক্রেটারের প্রান্তবর্তী কিছু এলাকায় একসময় উষ্ণ বা উত্তপ্ত ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থা ছিল। এ ধরনের পরিবেশে প্রাণের উদ্ভবের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
স্টিভেন লি বলেন, এসব এলাকায় একসময় মাটির নিচে উষ্ণ ও পানিসমৃদ্ধ পরিবেশ ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কয়েকজন প্রত্নজীববিজ্ঞানীর মতে, পৃথিবীতেও প্রাণের সূচনা একই ধরনের পরিবেশে হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, মঙ্গলের বিষুবরেখার কাছাকাছি গেল ক্রেটার এলাকায় কাজ করছে নাসার আরেক রোভার কিউরিওসিটি। পার্সিভ্যারেন্সের মতো কিউরিওসিটিও মঙ্গলের ভূতত্ত্ব ও অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতা, উন্নত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে পার্সিভ্যারেন্স মঙ্গল গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রোভারটির চলাচল ও যন্ত্রপাতি কার্যকর থাকলে আগামী কয়েক বছরেও মঙ্গলের প্রাচীন পরিবেশ এবং সম্ভাব্য প্রাণের চিহ্ন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

