সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

ইমরান সমর্থকদের বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা সংকটে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি শাসন

ইমরান খানের সমর্থকদের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার মধ্যে কেন্দ্রের হাতে বাড়তি ক্ষমতা, পিটিআইয়ের অভিযোগ ‘অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ’

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি শাসন জারি করা হয়েছে। কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থকদের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার প্রেক্ষাপটে রোববার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।

ইসলামাবাদ থেকে এএফপি জানায়, নিরাপত্তাসংক্রান্ত পাকিস্তানের সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদের আওতায় জারি করা জরুরি ব্যবস্থার ফলে প্রদেশটির ওপর কেন্দ্রীয় সরকার ব্যাপক প্রশাসনিক ক্ষমতা পাবে। এতে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা কার্যত সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকারি প্রতিনিধিদলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার বিষয়ে’ সুপারিশ পাওয়ার পর জরুরি ব্যবস্থা জারির আদেশে স্বাক্ষর করেন বলে তাঁর দপ্তর জানিয়েছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তর প্রকাশিত একটি ছবিতে আদেশটিতে তাঁর স্বাক্ষরের দৃশ্যও দেখা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা সরকারের

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দপ্তর জানিয়েছে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাদেশিক সরকারের কথিত উদাসীনতার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রদেশটিতে ইমরান খানের সমর্থকদের বিক্ষোভ ক্রমেই জোরালো হচ্ছিল। হাজারো পিটিআই সমর্থক বিভিন্ন স্থানে মিছিল করে তাঁর মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে দেশটির কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনাও বাড়ছে।

সরকারের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ আগে প্রদেশটির বিভিন্ন শহর ও জনপদে ‘লং মার্চ’ কর্মসূচি শুরু করেন পিটিআই সমর্থকেরা। বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে ইমরান খানকে তাঁর চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

পিটিআইয়ের ঘাঁটিতে কেন্দ্রের বাড়তি নিয়ন্ত্রণ

খাইবার পাখতুনখোয়া ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। প্রদেশটির সরকারও দলটির নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে জরুরি শাসন জারির সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

পিটিআই চেয়ারম্যান গোহর আলী খান এ পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গুরুতর রাজনৈতিক ভুল এবং একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘মানুষ তাদের অধিকারের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ কখনোই মেনে নেবে না।’

বিরোধী দলটির মতে, জরুরি শাসন জারির ফলে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিকে এ সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

পেশোয়ারসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা জোরদার

এএফপির এক প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে দেখা গেছে। প্রদেশটির অন্যান্য শহরেও বিভিন্ন সড়ক বন্ধ ছিল।

বিক্ষোভকারীদের কর্মসূচি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তবে জরুরি শাসনের আওতায় ঠিক কী ধরনের অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

কারাবন্দি ইমরান খান, অচলাবস্থায় আলোচনা

একসময় ব্যাপক জনপ্রিয় ক্রিকেট তারকা ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং সহিংসতায় উসকানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে কয়েক ডজন মামলা রয়েছে। ২০২৩ সালের মে মাসে সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দাঙ্গার পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়।

ইমরান খান ও তাঁর আইনজীবীরা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাঁদের দাবি, তাঁর জনপ্রিয়তা কমানোর উদ্দেশ্যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে মামলাগুলো করা হয়েছে।

বিরোধীদের শক্তি প্রদর্শনমূলক কর্মসূচি এড়াতে পাকিস্তান সরকার আলোচনা চালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে পিটিআইয়ের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে দলটির শাসনাধীন খাইবার পাখতুনখোয়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি শর্ত হিসেবে যুক্ত করেছিল সরকার।

গত ৪ অক্টোবর আলোচনা ভেঙে পড়ার পর বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর প্রদেশটির বিভিন্ন এলাকায় পিটিআই সমর্থকদের আন্দোলন আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ইমরান খানের মুক্তি এবং তাঁর চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার দাবিতে সমর্থকেরা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

আফগানিস্তান সীমান্তে সহিংসতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে আফগানিস্তান সীমান্তকেন্দ্রিক উত্তেজনা। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তান থেকে ছড়িয়ে পড়া সশস্ত্র তৎপরতার কারণে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান প্রদেশে হামলার ঘটনা বেড়েছে।

তবে কাবুলের তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগে পাকিস্তানের সমালোচনা করেছে তারা।

দুই দেশের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের জেরে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা ও সশস্ত্র সংঘাত দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। মার্চে যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী নিরাপত্তা সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা ঘটেছে।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটে পাকিস্তান

খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি শাসন জারির ঘটনা পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে বিরোধী দলের আন্দোলন, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্তবর্তী সহিংসতা মোকাবিলার চাপ—দুই দিক থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে দেশটির সরকার।

জরুরি ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশটির প্রশাসনের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং এর ফলে পিটিআইয়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে আলোচনার অচলাবস্থা নিরসন এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন