সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

জেলেনস্কির ওপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, ইউক্রেনে নতুন নেতৃত্বের আহ্বান

রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সমালোচনায় ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ইউক্রেনে রুশ হামলায় শিশুসহ নিহত ২১

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার পর তাঁকে সরিয়ে নতুন নেতা নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ইউক্রেনের এমন একজন নেতা প্রয়োজন, যিনি রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন ট্রাম্প। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার আরও বেশি ডিজেল সরবরাহের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, ইউক্রেন ও ইউরোপীয় মিত্ররা সতর্ক করে বলেছে, মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়ন আরও সহজ হবে।

এদিকে, রাশিয়ার সর্বশেষ হামলায় ইউক্রেনজুড়ে শিশুসহ অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও সংঘাতের তীব্রতা কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

জেলেনস্কিকে সরানোর আহ্বান ট্রাম্পের

রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করতে জেলেনস্কিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, সেই নির্দেশ উপেক্ষা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। এসব হামলার কারণে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত জ্বালানি সংকট আরও বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁর এ কাজ অবশ্যই বন্ধ করা উচিত।’

জেলেনস্কির সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি পরামর্শ দেব, তারা যেন এমন একজন নতুন নেতা পায়, যিনি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন। কারণ, তিনি অনেকবারই সমঝোতায় পৌঁছাতে পারতেন। কিন্তু কোনো এক কারণে তিনি তা করেননি।’

ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। কিন্তু কোনো এক কারণে জেলেনস্কি সমঝোতায় যেতে চান না।’

রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল

শুক্রবার ট্রাম্প জানান, পুতিনের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে। বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে তাঁরা একমত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। এ সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এ সিদ্ধান্তকে ‘দুর্বল সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, রাশিয়ার ওপর চাপ কমানো হলে দেশটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আরও বেশি অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পাবে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এরপর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও জ্বালানিসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এসব নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা কমিয়ে আনা।

জেলেনস্কির পাশে ইউরোপীয় মিত্ররা

রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস। অনলাইনে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, রাশিয়ার ওপর চাপ কমানোর সময় এখন নয়। ইউরোপ এ ধরনের পদক্ষেপ নেবে না বলেও জানান তিনি।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এক ফোনালাপে জেলেনস্কির প্রতি তাঁর ‘পূর্ণ সংহতি’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, রাশিয়ার ওপর ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তাঁর প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, ‘তিনি ইউক্রেনের জনগণের সমর্থন পান। আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার জনগণেরই।’

এদিকে ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় জেলেনস্কির সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, তাঁর নির্বাচন করা উচিত। তিনি অনেকবারই এ সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারতেন।’

জাপোরিঝিয়ায় রুশ হামলায় নিহত ২০

ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় উদ্ধার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝিয়ায় রাশিয়ার গ্লাইড বোমা হামলায় তিন শিশুসহ ২০ জন নিহত হয়েছেন।

হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জেলেনস্কি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে এ হামলার প্রসঙ্গ টেনে সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ‘আজ ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য রাশিয়া জাপোরিঝিয়ায় আবাসিক ভবনে পাঁচটি গ্লাইড বোমা ফেলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।’

এএফপির এক সংবাদদাতা উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত মানুষ ও মরদেহ উদ্ধার করতে দেখেছেন। উদ্ধারকর্মী দানিল পিশকিন এএফপিকে বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে এক নারী, তাঁর স্বামী ও একটি শিশুকে দেখা গেছে। দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও একটি ছোট মেয়ে মারা গেছে বলে জানান তিনি।

ইরিনা নামের ৬৯ বছর বয়সী এক বাসিন্দা জানান, বিমান হামলার সতর্কবার্তা পাওয়ার পর তিনি বাথরুমে আশ্রয় নেন। তবে তাঁর দুই প্রতিবেশী নিহত হয়েছেন। তাঁদের বয়স ছিল ৭৫ বছর। হামলায় তাঁরা রাস্তায় ছিটকে পড়েন এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান বলে জানান তিনি।

দিনিপ্রোপেত্রোভস্কে শিশু নিহত, কিয়েভে বিদ্যুৎবিভ্রাট

ইউক্রেনের আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় ১১ বছর বয়সী এক বালক নিহত হয়েছে।

এ ছাড়া রাশিয়ার হামলায় রাজধানী কিয়েভের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিদ্যুৎবিভ্রাট দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত একটি ‘ডেটা সেন্টারে’ হামলা চালানো হয়েছে।

একদিকে যুদ্ধের ময়দানে হামলা ও পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং সমঝোতার শর্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মায়ামিতে ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনা

যুদ্ধের অবসানে নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে মার্কিন, ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বৈঠকের সময়ই রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর চুক্তির ঘোষণা আসে।

জেলেনস্কির এক সহযোগী জানিয়েছেন, ইউক্রেনের প্রতিনিধিদল শনিবার দেশে ফিরছিল। মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, আলোচনায় ‘ইথ্রি, ইউরোপীয় কমিশন, ইউক্রেন ও ন্যাটো’ অংশ নিয়েছে।

বৈঠককে ‘গঠনমূলক’ আখ্যা দিয়ে উইটকফ বলেন, শীত আসার আগে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের উত্তেজনা কমানো, সংঘাতের অবসানের উপায় খোঁজা এবং দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

ক্রেমলিন জানিয়েছে, শুক্রবারের ফোনালাপে ট্রাম্প যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে তাঁর প্রস্তাবগুলো পুতিনকে জানিয়েছেন। ক্রেমলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, পুতিন প্রস্তাবগুলো ‘বুঝতে পেরেছেন’। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়ার দখলে

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধে বিপুল প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতেও প্রভাব পড়েছে।

যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং সমঝোতার শর্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের অবস্থানের পার্থক্য শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন