রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়, আটক মমতা-কেজরিওয়ালসহ একাধিক নেতা

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। ধ্রুব রাঠি ও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাদের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও পিনারাই বিজয়নসহ বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। পরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ ও ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতের ঘটনায় দিল্লিজুড়ে তৈরি হয়েছে উত্তেজনা।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ শুরুর আগেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, দলের নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করা হয়। এর আগে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও গুরুগ্রামের বাসভবন থেকে আটক করে পুলিশ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা বিরোধী নেতাদের মধ্যেও আটক হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নাগরিকদের ভোটাধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে।

মমতা-কেজরিওয়ালসহ বিরোধী নেতাদের আটক

যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়া বিক্ষোভকারীদের আটকে দেওয়ার পর আন্দোলনকারীরা দিল্লি হাটের দিকে মিছিল করার আহ্বান জানান। এ সময় তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাকেত গোখলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলের কয়েকজন নেতাকে দিল্লিতে তাঁদের বাসভবনের বাইরে থেকে আটক করেছে পুলিশ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ একাধিক বিরোধী নেতাকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সিপিআই(এম)-এর নেতাদেরও আটক করা হয়েছে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে আটক ব্যক্তিদের সবার ক্ষেত্রে আটকের সুনির্দিষ্ট সময়, স্থান, আইনি ভিত্তি এবং পরবর্তী অবস্থান সম্পর্কে একই রকম বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে ঘটনাগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দল ও পুলিশের বক্তব্য পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিমানবন্দরে আটক সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা

শনিবার সকালে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার আগেই দিল্লিতে পৌঁছানোর পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের বিমান থেকে নামার পরই আটক করা হয়েছে বলে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে তাঁদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট ছিল না। পরে সিজেপির পক্ষ থেকে ভিডিও বার্তায় জানানো হয়, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অজিনক্য শিন্ডে নেতৃত্ব দেবেন।

এক বিবৃতিতে সিজেপি অভিযোগ করে, বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই দলীয় নেতৃত্বকে অকার্যকর করে দিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁদের আটক করা হয়েছে। দলটির দাবি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ভণ্ডুল করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সিজেপি আরও বলেছে, এ ধরনের আটক চলাচলের স্বাধীনতার পরিপন্থী। দলটি অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকার অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে।

বাসভবন থেকে আটক ধ্রুব রাঠি

জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও শনিবার সকালে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর বাসভবন থেকে আটক করে পুলিশ। তিনি সিজেপির বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিতে দিল্লিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ অনুসারী থাকা এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে মন্তব্যের জন্য পরিচিত। বিক্ষোভে তাঁর অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কর্মসূচিটিকে ঘিরে জনমনে আগ্রহ বাড়িয়েছিল।

গুরুগ্রাম পুলিশের এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাঠিকে দিল্লিতে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল। তবে আটকের পর তাঁর বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং কতক্ষণ তাঁকে আটক রাখা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

পিনারাই বিজয়নসহ বামপন্থী নেতারাও আটক

দিল্লির বিভিন্ন স্থান থেকে কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ সিপিআই(এম)-এর একাধিক নেতাকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক নেতাদের মধ্যে দলটির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাও রয়েছেন।

এদিকে, বিভিন্ন বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশি পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং রাজনৈতিক মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভের অনুমতি না থাকার বিষয়টি সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

যন্তর মন্তর ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি ও সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষের ডাকা বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, প্রবেশপথ এবং বিক্ষোভস্থলের আশপাশে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে।

বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় আটকে দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সকালেই প্রায় ২০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করার খবর পাওয়া যায়। পরে আটক ব্যক্তির সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়।

কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ছিল অনুমতিহীন জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করা এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানো। তবে এত বড় নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ধরপাকড়ের ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

মেট্রো বন্ধ, ট্রেন বাতিল ও ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধ

বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে দিল্লির গণপরিবহনেও। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা, ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে দিল্লি মেট্রোর একাধিক স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থানপথ বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ট্রেনের চলাচলও ব্যাহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের কারণে সাধারণ যাত্রীদের চলাচলেও অসুবিধা তৈরি হয়েছে।

ভোটার তালিকার এসআইআর নিয়ে বিতর্ক

এই বিক্ষোভের মূল কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অভিযোগ করেছেন, ২০২৪ সাল থেকে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এত বড় পরিসরে নাম বাদ পড়া নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন এনডিএ এবং বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার এই সংখ্যা ও এর সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রভাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ভারতের নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, এসআইআর-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরো কমিশনের সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর এসআইআর কার্যক্রমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, গত ১০ মাসে এসআইআর কার্যক্রমের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি নিয়ে অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।

এই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। তবে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, কমিশনের বক্তব্য এবং স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের ধারাবাহিকতায় সিজেপি এর আগে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ করেছিল। এবার দিল্লির যন্তর মন্তরে কর্মসূচির ডাক দেওয়া হলেও অনুমতি না পাওয়ায় বিক্ষোভকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়।

একদিকে আন্দোলনকারীরা ভোটাধিকার রক্ষা ও নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির দাবি তুলেছেন, অন্যদিকে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বিরোধী নেতাদের আটক, গণপরিবহনে বিধিনিষেধ এবং ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতের খবর এই ঘটনাকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

সব মিলিয়ে, দিল্লির এই পরিস্থিতি ভারতের নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় এবং আটক নেতাদের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হয়, সেদিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন