২০২৮–২০৩৪ মেয়াদের বাজেটের আকার ও ব্যয়ছাঁট নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দুই প্রভাবশালী সদস্য ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হয়েছে। জার্মানির নেতৃত্বে কয়েকটি দেশ বাজেট কমানোর পক্ষে থাকলেও ফ্রান্সসহ অন্য সদস্যরা প্রতিরক্ষা, কৃষি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য থাকলেও রাজনৈতিক ও আর্থিক মতপার্থক্যে আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগামী সাত বছরের বাজেট নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৮ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত মেয়াদের জন্য প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইউরোর বাজেট প্রস্তাব করেছে ইউরোপীয় কমিশন। তবে বাজেটের আকার, ব্যয়ের অগ্রাধিকার এবং অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না থাকায় সমঝোতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজেটের আকার কমানোর পক্ষে জার্মানির নেতৃত্বে কয়েকটি দেশ অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সসহ একাধিক সদস্যদেশ মনে করে, প্রতিরক্ষা, কৃষি, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইইউর পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন।
ইইউর লক্ষ্য বড়দিনের আগেই বাজেট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো। তবে আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে তা ইউরোপের কয়েকটি দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের সময় পর্যন্ত গড়াতে পারে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান এবং ভবিষ্যতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২ ট্রিলিয়ন ইউরোর বাজেট প্রস্তাব ঘিরে বিরোধ
ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৮–২০৩৪ মেয়াদের জন্য ইইউর বাজেটের আকার হবে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইউরো। এর আগের ২০২১–২০২৭ মেয়াদের বাজেট ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউরো।
নতুন প্রস্তাবে বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে ব্যয়সংকোচনের পক্ষে থাকা দেশগুলোর যুক্তি, সদস্যরাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক সংযমের নীতি অনুসরণ করছে, তখন ইইউর বাজেট এতটা বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জার্মানির নেতৃত্বে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন বাজেট থেকে কয়েক শ বিলিয়ন ইউরো কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
অন্যদিকে, ফ্রান্স মনে করে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দায়িত্ব বেড়েছে। সে অনুযায়ী প্রতিরক্ষা, কৃষি, শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন।
ব্যয়ছাঁটের বিরোধিতায় ফ্রান্স, প্রতিরক্ষায় বাড়তি অর্থের দাবি
ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং ইইউর গুরুত্বপূর্ণ অর্থদাতা দেশ ফ্রান্স প্রস্তাবিত বাজেটে বড় ধরনের ব্যয়ছাঁটের বিরোধিতা করছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ইউরোপের ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রয়োজন।
গত মাসে তিনি বলেন, “আমাদের একটি উচ্চাভিলাষী ইউরোপীয় বাজেট প্রয়োজন। ইইউর অগ্রাধিকারগুলো, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে সহায়তা দিতে আমাদেরকে আরও শক্তিশালী ইউরোপীয় বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।”
ফ্রান্সের অবস্থান অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষকদের সহায়তা এবং ইউরোপীয় অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন অপরিহার্য।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় কৃষি খাতকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতেও অর্থ প্রয়োজন।
ফলে বাজেটের আকার নিয়ে বিরোধটি শুধু মোট ব্যয়ের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইউরোপের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকার কী হবে, সেই প্রশ্নও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
কৃষি ও আঞ্চলিক উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি
বাজেট নিয়ে মতবিরোধের আরেকটি দিক হলো কৃষি ও আঞ্চলিক উন্নয়ন খাতে অর্থ বরাদ্দ। দক্ষিণ, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ১৭টি দেশ ‘ফ্রেন্ডস অব কোহেশন’ বা ‘সংহতির পক্ষে বন্ধুরা’ নামে একটি জোট গঠন করেছে। জোটটির দাবি, কৃষি ও আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে।
এই দেশগুলোর কাছে ইইউর বাজেট শুধু প্রশাসনিক ব্যয়ের বিষয় নয়; বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
অন্যদিকে, ব্যয়সংকোচনের পক্ষে থাকা দেশগুলো মনে করে, বাজেটের আকার বাড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যমান অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দুই পক্ষের এই অবস্থান বাজেট আলোচনায় নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। কারণ, একদিকে আর্থিক সংযমের দাবি রয়েছে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও কৃষি সহায়তা বজায় রাখার চাপও রয়েছে।
বড়দিনের আগে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা
বর্তমানে ইইউর পর্যায়ক্রমিক সভাপতির দায়িত্বে থাকা আয়ারল্যান্ড শনিবার বাজেটের একটি সংশোধিত প্রস্তাব প্রকাশ করার কথা রয়েছে। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য কমিয়ে সমঝোতার পথ তৈরি করাই এ প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।
এক জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কূটনীতিক সংশোধিত প্রস্তাব প্রকাশের আগে আলোচনাকে ঘিরে চলা জল্পনা নাকচ করে বলেন, “এই কাজটি সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সবার মধ্যেই তাগিদ রয়েছে।”
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পর্যায়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করাকে খুব একটা ফলপ্রসূ মনে করা হচ্ছে না। অর্থাৎ, সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
শনিবারের সংশোধিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে আগামী সপ্তাহে ব্রাসেলসে টানা দুই দিন বৈঠকে বসবেন ইইউর নেতারা। সেখানে বাজেটের আকার, ব্যয়ের অগ্রাধিকার এবং অর্থায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে দর-কষাকষি হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার শেষ পর্যায়ে বড় ধরনের মতবিরোধ এবং পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
বাজেট নিয়ে আলোচনার সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার সঙ্গে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও যুক্ত হয়েছে। আগামী মাসে স্পেনে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা আলোচনাকে আরও জটিল করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাজেট নিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হলে তা ইউরোপীয় সহযোগিতা ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়াতে পারে।
এদিকে, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের রাজনৈতিক অবস্থানও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছে। দেশটিতে অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের নির্বাচনী উত্থান জার্মানির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সেও বাজেটসংকটের চাপ রয়েছে। দেশটির উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন জাতীয় ঋণের বোঝা কমানোর একটি উপায় হিসেবে ইইউর বাজেটে ফ্রান্সের আর্থিক অবদান কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
এ ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ইউরোপীয় নেতাদের জন্য বাজেট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
নতুন করের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা
ইইউর বাজেটের জন্য অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউরোপীয় কমিশন সদস্যদেশগুলোর কাছ থেকে সরাসরি বেশি অর্থ নেওয়ার পরিবর্তে রাজস্বের নতুন উৎস তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে।
এ লক্ষ্যে বড় কোম্পানির ওপর কর আরোপ, ইলেকট্রনিক বর্জ্যের ওপর শুল্ক এবং তামাকজাত পণ্যের কর বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আরও বিস্তৃত রাজস্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান এবং অনলাইন জুয়াব্যবস্থার ওপর কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে ডিজিটাল খাতের ওপর কর আরোপের প্রস্তাবও অনেক দেশের সমর্থন পাচ্ছে না। ফলে নতুন রাজস্ব উৎস তৈরি করে বাজেটের অর্থায়ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনাতেও ঐকমত্যের অভাব রয়েছে।
নতুন করব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে এবং সদস্যদেশগুলো এ বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা বাজেট আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত আইনি সময়সীমা
ইইউর লক্ষ্য চলতি বছরের বড়দিনের আগেই বাজেট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো হলেও আইনগতভাবে এ বছরই বাজেট চূড়ান্ত করা বাধ্যতামূলক নয়। বাজেট অনুমোদনের চূড়ান্ত আইনি সময়সীমা ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত।
তবে রাজনৈতিকভাবে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, দীর্ঘ আলোচনার ফলে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আরও বাড়তে পারে এবং নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৮–২০৩৪ মেয়াদের বাজেট নিয়ে ফ্রান্স ও জার্মানির বিরোধ ইইউর ভবিষ্যৎ ব্যয়নীতি, প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকার, কৃষি সহায়তা এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে বৃহত্তর মতপার্থক্যকে সামনে এনেছে। সংশোধিত প্রস্তাব ও আসন্ন বৈঠকগুলোতে সদস্যদেশগুলো কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী সাত বছরের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক পরিকল্পনার পরবর্তী অগ্রগতি।

