প্রত্যর্পণ অনুরোধ ‘আইনি প্রক্রিয়ায়’, আদালতও যুক্ত—ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য ঘিরে দেশটির মিডিয়ায় আলোচনা
ভারতীয় মিডিয়ায় গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন • ঢাকার অনুরোধ পরীক্ষা করছে নয়াদিল্লি • ‘কেউ সময়সীমা দিতে পারবে না’ • ২০২৪ সালে হাসিনাকে বহন করেছিল বাংলাদেশের বিমান • ‘তখন তাঁকে গ্রহণ করা ছাড়া খুব বেশি বিকল্প ছিল না’—ভারতীয় দূত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রান্তকাল
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারবে না ভারত—ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর এমন বক্তব্য দেশটির একাধিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Tribune, The Telegraph India, NDTV ও India Today শনিবার (৩ অক্টোবর) ত্রিবেদীর বক্তব্যের ভিত্তিতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশের করা অনুরোধ একটি প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং এতে আদালতও যুক্ত রয়েছে। সে কারণে বিষয়টির নিষ্পত্তি কবে হবে, তা নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার।
ঢাকায় পঞ্চম ‘Bay of Bengal Conversation 2026’-এর একটি প্যানেল আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ত্রিবেদী এ মন্তব্য করেন।
‘কেউ সময়সীমা দিতে পারবে না’
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বারবার অনুরোধের বিষয়ে ত্রিবেদী বলেন, ভারত সরকার আগেও জানিয়েছে যে এ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ও সুগঠিত আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া চলমান।
আদালতও এর সঙ্গে যুক্ত থাকায় শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে ‘কেউ কোনো সময়সীমা দিতে পারবে না’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এর আগে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে।
হাসিনা কীভাবে ভারতে গেলেন, ব্যাখ্যা ভারতীয় দূতের
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়ার পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেছেন ত্রিবেদী।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি স্পষ্ট করেন—শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা দেশটির সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি।
বরং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের একটি বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজে তিনি ভারতে পৌঁছান।
ত্রিবেদীর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় বাংলাদেশের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল এবং শেখ হাসিনা যখন ভারতে পৌঁছান, তখনকার পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লি আগে থেকে এমন ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
‘তখন ভারতের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না’
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো সেই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার উড়োজাহাজকে ভারতে অবতরণের অনুমতি দেওয়া ছাড়া নয়াদিল্লির সামনে কার্যত খুব বেশি বিকল্প ছিল না।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা যখন ভারতে পৌঁছান, তখনও তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে তখনকার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
ত্রিবেদী প্রশ্ন তোলেন, ভারত যদি সে সময় উড়োজাহাজটিকে অবতরণের অনুমতি না দিত, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা বলা কঠিন।
তিনি ২০২৪ সালের ওই পরিস্থিতিকে ‘দুঃখজনক’ হিসেবেও বর্ণনা করেন এবং এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি কোথাও না হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্ব
ত্রিবেদীর বক্তব্যটি ভারতের একাধিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম প্রায় একই সময়ে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে।
The Tribune শিরোনামে তুলে ধরেছে—Delhi can’t provide deadline on Hasina’s extradition: Indian envoy।
অন্যদিকে The Telegraph India বিষয়টিকে সামনে এনেছে—‘India can’t give you a timeframe’ বক্তব্য দিয়ে।
NDTV এবং India Today-ও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় থাকার বিষয়টিকে তাদের প্রতিবেদনে গুরুত্ব দিয়েছে।
ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে চলমান আলোচনার মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনারের সর্বশেষ বক্তব্য নতুন করে দেশটির সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছে।
বাংলাদেশ–ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি একই বছরের অক্টোবরে কার্যকর হয়। চুক্তিতে উভয় দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট শর্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অভিযুক্ত, দণ্ডিত বা বিচারিকভাবে চাওয়া ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের বিধান রয়েছে।
তবে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কী হবে, সে বিষয়ে ভারত এখনো কোনো সময়সীমা ঘোষণা করেনি।
ভারতীয় হাইকমিশনারের সর্বশেষ বক্তব্যেও প্রত্যর্পণ হবে বা হবে না এমন কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং তিনি বিষয়টি চলমান আইনি প্রক্রিয়ার অধীন বলেই উল্লেখ করেছেন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও বার্তা
একই আলোচনায় বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন দীনেশ ত্রিবেদী। তাঁর মতে, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে সমস্যার সমাধান হতে হবে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে।
পানি, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, যোগাযোগ ও পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যকার সমস্যার সমাধানের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক আস্থা।
বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, তার ওপর ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক নির্ভর করে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যেমন নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অধিকার রাখে, ভারতও তেমনি নিজের স্বার্থ রক্ষার অধিকার রাখে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে অবশ্য তাঁর বার্তা স্পষ্ট বাংলাদেশের অনুরোধ নিয়ে ভারতের আইনি প্রক্রিয়া চলছে; কিন্তু সেটি কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনই কোনো সময়সীমা দিচ্ছে না নয়াদিল্লি।
সূত্র: The Tribune, The Telegraph India, NDTV, India Today ও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নথি

