মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভাদ্রজুড়ে তালের মৌ মৌ ঘ্রাণ, পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত গাইবান্ধার গ্রাম

ভাদ্র মাস এলেই গ্রামবাংলার পথে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়ে পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ। উঠান থেকে রান্নাঘর ,সবখানেই শুরু হয় তাল সংগ্রহ ও পিঠা তৈরির ব্যস্ততা। ভাদ্রের শেষ সময়ে এসে সেই ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। গাইবান্ধার সাত উপজেলাজুড়ে এখন চলছে তালের পিঠা তৈরির ধুম। বিশেষ করে গোবিন্দগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘরে ঘরে চলছে পাকা তাল দিয়ে নানা ধরনের পিঠা তৈরির আয়োজন।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা, নলডাঙ্গা, হরিপুর, পাঁচপীর ও শ্রীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন পাকা তালের ঘ্রাণে মুখর পরিবেশ। কোথাও তাল পাড়ার ব্যস্ততা, কোথাও কচি তালের শাঁস খাওয়ার আয়োজন, আবার কোথাও পাকা তাল সংগ্রহ করে রস ছেঁকে পিঠার উপকরণ তৈরির প্রস্তুতি চলছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামবাংলার পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতে তালের পিঠার রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। বিশেষ করে জামাই বাড়িতে এলে তালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়নের রেওয়াজ এখনও অনেক এলাকায় প্রচলিত। ভাদ্র মাস শেষ হওয়ার আগেই প্রিয় জামাইকে তালের পিঠা খাওয়াতে অনেক পরিবার আগে থেকেই পাকা তাল সংগ্রহ করে রাখছেন।

স্থানীয়রা জানান, তালের মৌসুম দীর্ঘ নয়। ভাদ্রের শেষ দিকে তাল পাকতে শুরু করলেই পিঠা তৈরির ব্যস্ততা বাড়ে। পাকা তাল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ভাপা তাল, তালের পিঠা, তালের কেক, নারকোলি তালসহ বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার।

পাকা তালের ঘন রসের সঙ্গে চালের গুঁড়া, চিনি, নারকেলসহ বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে এসব পিঠা তৈরি করা হয়। মাটির চুলায় কিংবা ভাপে তৈরি তালের পিঠা শুধু সুস্বাদুই নয়, এটি বাঙালির দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যেরও অংশ। তালের পিঠার স্বাদে অনেকেরই মনে পড়ে যায় শৈশবের গ্রামীণ জীবনের নানা স্মৃতি।

বামনডাঙ্গার তাল ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ বলেন, “এখন পাকা তালের চাহিদা অনেক বেশি। একটি তাল ১০০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ভালো ও বড় তাল হলে এর চেয়েও বেশি দাম পাওয়া যায়। দাম বেশি হলেও মানুষ তাল কিনছেন—পিঠা খাবেন, পরিবারের সবাইকে খাওয়াবেন, আবার জামাইকেও খাওয়াবেন।”

তিনি বলেন, শুধু পাকা তাল নয়, কচি তালেরও চাহিদা রয়েছে। কচি তাল থেকে শাঁস ও বিচি খাওয়ার কারণে অনেক তাল পাকার আগেই বিক্রি হয়ে যায়। আবার অনেকে মৌসুমে পাকা তাল বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।

স্থানীয় গৃহিণীরা জানান, তালের পিঠা শুধু একটি খাবার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক আনন্দ, অতিথি আপ্যায়ন ও গ্রামীণ ঐতিহ্য। বিশেষ করে জামাইকে তালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করা অনেক পরিবারের কাছে এখনও একটি আনন্দের আয়োজন।

ভাদ্রের শেষপ্রান্তে এসে গাইবান্ধার গ্রামগুলোতে তাই তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তালগাছের নিচে পাকা তালের স্তূপ, বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা এবং ঘরে ঘরে তালের পিঠার সুবাস সব মিলিয়ে ফুটে উঠেছে বাংলার চিরচেনা ঋতুচিত্র।

তালের মৌসুম একসময় শেষ হবে। তালগাছের নিচে পড়ে থাকবে শুকনো পাতা। তবে ভাদ্রের পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ ও গরম ভাপে তৈরি তালের পিঠার স্বাদ মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাবে দীর্ঘদিন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিই যেন ভাদ্রের শেষবেলায় নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে গাইবান্ধার গ্রামগুলোতে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন