শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে যা যা চাইলেন দক্ষিণের সাংবাদিকরা

বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়কটি ছয় লেইনে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছে বরিশাল বিভাগ সাংবাদিকদের একটি সংগঠন।

শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের এলডি হলে বরিশাল ডিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিজেএ) উদ্যোগে আয়োজিত ‘আগামীর বরিশাল; সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধে দক্ষিণাঞ্চলের জন্য একটি পৃথক উপকূলীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গঠনেরও দাবি জানানো হয়।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল।

তিনি বলেন, “ঢাকা-পদ্মা সেতু বরিশাল-পটুয়াখালী-পায়রা রেল করডোরকে জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা। অতি দ্রুত ভাঙা থেকে কুয়াকাটা সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা।”

পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, “বরিশাল অঞ্চলকে কেবল শস্যভান্ডার নয়, বরং দক্ষিণ বাংলাদেশের মূল অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি সরকারের ভিশন দরকার।”

পায়রা বন্দরকে শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনার দাবি জানিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর বলেন, “ভবিষ্যতে যদি প্রতিবেশি দুই দেশ মিয়ানমার বা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধ হয়-কোনো ঝামেলা হয় তখন কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের বন্ধ রাখতে হতে পারে। তখন বিকল্প হিসেবে পায়রা বন্দর বাণিজ্যিক কাজটি কিন্তু করতে পারবে, কন্টেইনার চলাচল করতে পারবে। কারণ পায়রা বন্দরের দিকে তো কোনো দেশ নাই সবই সমুদ্র।”

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “অপার সম্ভাবনা থাকার পরও বরিশাল অঞ্চল উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কারখানা স্থাপন না হওয়ায় অনেক দিক থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তৈরির ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তি হচ্ছে পানি। পানির ওপর দাঁড়িয়ে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম। বরিশাল বিভাগজুড়ে বিপুল পরিমাণ পানি থাকার পরও আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না।”

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান বলেন, “বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে যেমন আমাদের কাজ করতে হবে, তেমনি উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে গুরুত্ব দিতে হবে ভবিষ্যতে ভালো রাজনীতিবিদ, দক্ষ ও ভালো নেতৃত্ব তৈরি করতে।”

বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়নে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে মন্তব্য করে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, ‘‘আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে হবে। সবার মধ্যে ঐক্য দরকার সবার আগে। রাস্তাঘাট, সেতুসহ যেসব দাবি উঠেছে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন কিছু না।’’

অতীতে উন্নয়নের অনেক কাজ ‘থামিয়ে দেওয়া হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর।

তিনি বলেন, “এই অঞ্চলের মানুষ এখন ভাগ্যবান। এখন আমাদের স্বর্ণযুগ। তাই গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারলে সামগ্রিক উন্নয়ন করা সহজ হবে।”

পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে সকলের সহযোগিতা দরকার। এখানেই শেরে বাংলার মত নেতার জন্ম হয়েছে। আমরা এখন এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে ভিক্ষা চাই।”

বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবুর রহমান সরোয়ার, ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল এবং পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন দুলালও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

বছরে প্রচুর তরমুজ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। তা সংরক্ষণ করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব মন্তব্য করে বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট নিজাম উদ্দিন বলেন, “বরিশালের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করে ২৫ বছরের জন্য কর মওকুফ সুবিধা চাই।”

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আকন কুদ্দুস এবং সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামানও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

বিডিজেএর সভাপতি মাহবুব সৈকতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সানবির রুপল ও নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী জেবেল।

অনুষ্ঠানে শ্যামলীর ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার শিল্পী, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম খসরু ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্য বক্তব্য দেন।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশে উৎপাদিত মোট ইলিশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ বরিশাল বিভাগ থেকে সরবরাহ হয়। বরিশালে বিসিক শিল্পনগরী থাকা সত্ত্বেও মূলধনের সংকট ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ব্যবসায়ীরা ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন।

লবণাক্ততার কারণে উপকূলের ২ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে সুপেয় পানির সংকট সমাধানসহ ১০টি দাবি তুলে ধরা হয়।

দাবিগুলো হলো—

১. নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ, সুপেয় পানি ও ডেল্টা অভিযোজনের জন্য পৃথক ‘উপকূলীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ গঠন।

২. ঢাকা-পদ্মা সেতু-বরিশাল-পটুয়াখালী-পায়রা রেল সংযোগ চালু এবং ভাঙ্গা-কুয়াকাটা সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা। এতে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যেতে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগবে বলে মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

৩. দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডোর গড়তে বছরে ৭৫ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিক হাব ও প্রসেসিং অঞ্চল গড়ে তোলা।

৪. ধান, মাছ, পেয়ারা ও আমড়ার মূল্য সংযোজনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোল্ড চেইন ও প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করা।

৫. নদীভাঙন, প্লাবন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ‘ডেল্টা মাস্টারপ্ল্যান’ গ্রহণ।

৬. সাশ্রয়ী পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ ড্রেজিং ও ব্লু ইকোনমি সম্প্রসারণ করা। বরিশাল, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, বরগুনা ও সুন্দরবনকে যুক্ত করে পর্যটন সার্কিট তৈরি এবং তরুণদের ঢাকামুখী প্রবণতা কমাতে আইটি হাব, কারিগরি ও মেরিন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

৭. নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি উপকূলীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ।

৮. নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

৯. বিশেষায়িত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে বরিশালকে গড়ে তোলা।

১০. বরিশাল আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সমন্বিত উন্নয়ন কাউন্সিল গঠন করা।

ছবি : বিডিনিউজটুয়েন্টিফোর


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন