রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বদলে যাচ্ছে ডাক বিভাগের কার্যক্রম, স্পিড পোস্টে দুই মাসে ৪০০ টন পণ্য পরিবহন

একসময় চিঠি ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম ছিল ডাক বিভাগ। জিপিও থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পোস্ট অফিসগুলোতে সেবা নিতে গ্রাহকদের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ানোর দৃশ্য ছিল নিত্যদিনের। সময়ের সঙ্গে ডিজিটাল যোগাযোগ ও বেসরকারি কুরিয়ার সেবার বিস্তারে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন সেবা যুক্ত করে এবার নিজেদের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান।

শুধু চিঠি কিংবা ছোট প্যাকেট নয়, এখন ডাক বিভাগের স্পিড পোস্টের মাধ্যমে ফ্রিজ, আলমারি, ওয়ারড্রব, মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের কাঁথা-বালিশ ও বিছানাপত্র, রান্নাঘরের বিভিন্ন সামগ্রী এবং কীটনাশক স্প্রে মেশিনও পাঠানোর সুযোগ রয়েছে এ সেবায়।

ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। এর মধ্যে মৌসুমি ফলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে। ডাক বিভাগের ইতিহাসে এত বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনের ঘটনা আগে ঘটেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, দেশের আইনে অবৈধ নয়—এমন যেকোনো পণ্য স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পরিবহন করা যাবে। সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি মোটরসাইকেলও ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। গ্রাহকের চাহিদা বাড়ায় ধীরে ধীরে সেবার পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাভের অঙ্ক আমাদের কাছে মুখ্য নয়। সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ সেবা দিয়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে একসূত্রে যুক্ত করাই হবে স্পিড পোস্টের প্রকৃত সাফল্য।”

২৪ ঘণ্টায় জেলা থেকে ঢাকায়

স্পিড পোস্ট সেবাকে সুশৃঙ্খল ও দ্রুত করতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেছে ডাক অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট পোস্ট অফিসকে জেলা শহর থেকে ঢাকায় পাঠানো পণ্য সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা এবং প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলের পণ্য সর্বোচ্চ ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে বিলির জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে।

তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু পণ্য এ সেবার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ, ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক রাসায়নিক, মাদকদ্রব্য, জীবন্ত প্রাণী, আগ্নেয়াস্ত্র এবং ভরা বা খালি গ্যাস সিলিন্ডার স্পিড পোস্টে পাঠানো যাবে না।

গ্রাহকদের সুবিধার জন্য চালু করা হয়েছে অনলাইন মাশুল ক্যালকুলেটর। এর মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর আগেই সম্ভাব্য পরিবহন খরচ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। বর্তমানে রাজধানীর জিপিও ছাড়াও গুলশান, বনানী, মিরপুর ও উত্তরাসহ কয়েকটি সাব-পোস্ট অফিস থেকে সরাসরি পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পার্সেল পাঠানোর জন্য রয়েছে বৈদেশিক ইএমএস সেবা।

আস্থার জায়গা তৈরি করেছে পোস্টাল ভোট

ডাক বিভাগের নতুন সেবার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম।

তিনি জানান, গত সংসদ নির্বাচনে ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন। ভোট প্রদান থেকে শুরু করে ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের তথ্য প্রবাসী ভোটাররা বার্তার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। এতে ডাক বিভাগের সেবার প্রতি তাদের আস্থা বেড়েছে।

মহাপরিচালকের মতে, এই আস্থা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা নিজেদের প্রয়োজনেই স্পিড পোস্ট ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাদের মাধ্যমেই অনেকটা বিনা প্রচারণায় সেবাটির পরিচিতি বাড়ছে।

এবার আন্তঃজেলা বাসাবদলের পরিকল্পনা

স্পিড পোস্টের জনপ্রিয়তা বাড়ায় ভবিষ্যতে দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বাসাবাড়ির মালামাল পরিবহনের সেবা চালুর পরিকল্পনাও করছে ডাক বিভাগ।

কাজী আসাদুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি একজন গ্রাহক এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি হওয়ার সময় পুরো বাসার আসবাবপত্র ডাক বিভাগের মাধ্যমে পরিবহনের আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডাক বিভাগে এ ধরনের সেবা চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এমন সেবা চালুর লক্ষ্যে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সক্ষমতা গড়ে তোলা হচ্ছে।

এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব একটি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৫০টি বৈদ্যুতিক বাইক সংগ্রহ করা হয়েছে। গ্রিন এনার্জির মাধ্যমে পরিচালিত এসব যান ডাক বিভাগের পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা হবে।

বদল আসছে মেইল ব্যবস্থাপনাতেও

ডাক বিভাগের মেইল ব্যবস্থাপনাতেও আনা হচ্ছে পরিবর্তন। কমলাপুরের রেলওয়ে মেইল সার্ভিসের বর্তমান সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ায় সেখানে পরীক্ষার খাতা, গাছের চারা ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য একসঙ্গে ব্যবস্থাপনা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

এ কারণে ঢাকা জিপিও ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ করে সেখানে বিদেশগামী ও বিদেশ থেকে আসা আমদানি-রপ্তানি পার্সেল ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তেজগাঁও ও কমলাপুরসহ মোট তিনটি হাবকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে মেইল ব্যবস্থাপনা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে, ঢাকার তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেইল প্রসেসিং সেন্টারকে শতভাগ কাজে লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা দেশ থেকে ঢাকায় আসা মেইল, ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো মেইল এবং ঢাকা শহরের অভ্যন্তরীণ মেইল—সবই একটি কেন্দ্র থেকে প্রক্রিয়াজাত করা হবে। এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক বিভাগের মহাপরিচালক।

সেবার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্য

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্পিড পোস্ট সেবা চালু করা হয়। শুরুতে মৌসুমি ফল পরিবহনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে নিত্যব্যবহার্য ও বড় আকারের বিভিন্ন পণ্য পরিবহনেও এ সেবা সম্প্রসারিত হয়েছে।

ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে বেসরকারি কুরিয়ার সেবার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানকে আরও আধুনিক ও গ্রাহকবান্ধব হতে হবে। সে লক্ষ্যেই ধাপে ধাপে প্রযুক্তি, পরিবহন ও লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

ডাক বিভাগের মহাপরিচালকের ভাষায়, জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ সেবা দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মানুষকে একটি কার্যকর নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসাই হবে এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন