শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬

রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার খুন: ঘটনার বর্ণনায় নতুন মোড়

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের স্থান, সময় ও সম্ভাব্য কারণ নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে বাসার তৃতীয় তলার খোলা ছাদে হত্যা করা হয়। পরে স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির দিকে সরিয়ে রাখা হয়। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাসকে দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রংপুর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার।

পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করতেন। তাঁদের দাবি, পাশের বাড়ির ছাদ খোলা থাকলেও গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে দেয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। এ কারণে তাঁরা পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতেন।

সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে আব্দুল মাবুদ বলেন, ঘটনার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ একসঙ্গে আটটি ইয়াবা সেবন করেন। ভোরের পর গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাঁদের দেখতে পান এবং ধমক দেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ও ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ শুনে ছাদে চলে এলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চিৎকার ঠেকাতে প্রথমে তাঁদের গলা ও মুখ চেপে ধরা হয়। পরে গামছা ও রশি ব্যবহার করে শ্বাসরোধ করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

হত্যাকাণ্ডের পর দুই অভিযুক্ত নিচতলায় গিয়ে একটি পুরোনো প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন বলেও জানান পুলিশ কমিশনার। তাঁর ধারণা, বাড়িতে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যেই বিদ্যুতের তার কাটা হয়ে থাকতে পারে।

পরে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে সরিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশের দাবি। পাশের বাড়ির ছাদ থেকে যাতে মরদেহ দেখা না যায়, সে কারণেই এমনটি করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে পুলিশ।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, এরপর দুই অভিযুক্ত গণপতি চক্রবর্তীর কক্ষে প্রবেশ করলে তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং সিদ্ধার্থ দাসকে দেখতে পায়। এ সময় সে সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে প্রশ্ন করলে আশপাশের কেউ শব্দ শুনে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন অভিযুক্তরা।

আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা

গত রোববার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানিয়েছিল, গণপতি চক্রবর্তীকে ভোরে বাসার ছাদে, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে তিনতলার সিঁড়িতে এবং আয়ুশকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে।

তবে বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে নতুন ব্যাখ্যা দেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিশুটিকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। পরে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলেছিল বলে নতুন তথ্য উঠে আসে।

হত্যার কারণ নিয়েও নতুন তথ্য

হত্যার কারণের ক্ষেত্রেও নতুন তথ্য সামনে এনেছে পুলিশ। গত রোববার পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে দুই তরুণ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

তবে বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি জমিজমা সংক্রান্ত পুরোনো বিরোধ বা অসন্তোষও হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।

সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের একটি জমি কিনেছিল। জমিটি তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হলেও সিদ্ধার্থের পরিবারের শরিকেরা তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় সিদ্ধার্থের মধ্যে কোনো ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এ ছাড়া গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। পুলিশ কমিশনার বলেন, মাছুয়াপাড়া এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা দাস বংশের হলেও গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের। তাঁদের মধ্যে রাস্তাঘাটে দেখা-সাক্ষাৎ হলেও পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল না। এই সামাজিক দূরত্ব বা অন্য কোনো বিষয় অভিযুক্তদের মধ্যে ক্ষোভের কারণ ছিল কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের দাবি, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ঘটনার সব দিক নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন