জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি বৈধ যাতায়াত ও বাণিজ্য সহজ করতে সমন্বিত ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
আধুনিক, সমন্বিত ও প্রযুক্তিভিত্তিক নিরাপদ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করার জন্য অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক যাতায়াত ও বাণিজ্য সহজ করার পাশাপাশি সীমান্ত অতিক্রমকারী বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের মেঘনা হলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ইমিগ্রেশন ও বর্ডার গভর্নেন্স সংক্রান্ত আইওএম কৌশলগত রূপরেখা (২০২৭–২০৩১)’ শীর্ষক ব্রিফিং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় গুরুত্ব
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বহির্বিশ্বের সঙ্গে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত। এ পরিস্থিতিতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈধ ভ্রমণ ও বাণিজ্যকে গতিশীল করতে হবে।
সরকারের ‘জাতীয় সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কৌশল ২০২৬–২০৩১’ এবং ‘পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন রূপরেখা ২০২৬–২০৩১’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দায়িত্বশীল ব্যবহার, কাগজবিহীন প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সরকারি সেবাগুলোর মধ্যে আন্তঃকার্যক্ষমতা বৃদ্ধি বর্তমান সরকারের মূল অগ্রাধিকার।
বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশের বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্টগুলোর কার্যক্রমগত সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর না রেখে মানবাধিকার ও সুরক্ষার প্রতি সংবেদনশীল এবং পেশাদার মানদণ্ডে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মানব পাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বয়
বহুজাতিক অপরাধ, মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কোনো একক সংস্থার দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে আইওএমের প্রস্তাবিত ২০২৭–২০৩১ মেয়াদের কৌশলগত রূপরেখাকে স্বাগত জানান তিনি। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে আইওএমের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর অনুরোধ জানান তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ বিশ্বায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে সহযোগিতায় আগ্রহী আইওএম
ব্রিফিংয়ে আইওএম বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ড. লরা টম বন্ডে বলেন, অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, ভ্রমণের ধরন ও কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয়ের প্রয়োজন বাড়বে। কারিগরি দক্ষতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে আইওএম সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. কামরুল আহসান এবং উপপুলিশ মহাপরিদর্শক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোসহ বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। বৈধ যাতায়াত ও বাণিজ্য সহজ করার পাশাপাশি মানব পাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং পরিচয় জালিয়াতির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপায় নিয়ে তাঁরা মতবিনিময় করেন।
কৌশলগত রূপরেখায় চারটি সহযোগিতার ক্ষেত্র
আইওএমের প্রস্তাবিত কৌশলগত রূপরেখায় সম্ভাব্য সহযোগিতার চারটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো—
- সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা।
- ডিজিটাল ব্যবস্থা ও তথ্য আদান-প্রদান।
- প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি।
- নির্বাচিত সীমান্ত পয়েন্টে অবকাঠামো ও সেবার উন্নয়ন।
এই রূপরেখা প্রণয়নে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন রূপরেখা (জুলাই ২০২৬–জুন ২০৩১) বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

