ষষ্ঠ দিনেও শ্রমিক বিক্ষোভে অচল সড়ক; সংঘর্ষে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, শিল্পাঞ্চলে বিজিবিসহ যৌথ বাহিনী মোতায়েন।
তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে ষষ্ঠ দিনেও উত্তপ্ত ঢাকার শিল্পাঞ্চলগুলো। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে সাভারের হেমায়েতপুর ও ফুলবাড়িয়া এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন আন্দোলনরত শ্রমিকেরা। সেখানে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ চলছে। অন্যদিকে, গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছেন শ্রমিকেরা। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে।
সাভারে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ
সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। এর আগে সকালে আন্দোলনকারীরা হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে জড়ো হয়ে একসঙ্গে মহাসড়কের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ দুই দফায় কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এতে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
তবে ছত্রভঙ্গ হওয়ার পরও শ্রমিকেরা আশপাশের বিভিন্ন গলি ও সড়কে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান নেন। এতে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
হেমায়েতপুরে আট কারখানায় সাধারণ ছুটি
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বুধবার সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে হেমায়েতপুর ও পদ্মার মোড় এলাকার আটটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
কারখানাগুলো হলো—দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ওভেন লিমিটেড, দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ওয়াশ লিমিটেড, সামশ স্টাইলিং ওয়্যার লিমিটেড, রূপকথা অ্যাপারেলস লিমিটেড, পদ্মা ক্যান্স লিমিটেড, ব্যাবিলন ক্যাজুয়াল ওয়্যার লিমিটেড, অবনী নিট ওয়্যার লিমিটেড এবং জিন্স ম্যানুফ্যাকচার লিমিটেড।
এ ছাড়া ম্যাক্সকম ইন্টারন্যাশনাল বিডি লিমিটেড ও পাইওনিয়ার অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিকেরা কর্মবিরতি পালন করছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চলে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। হেমায়েতপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন।
গাজীপুরে ২৫ প্লাটুন যৌথ বাহিনী মোতায়েন
এদিকে, গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছেন শ্রমিকেরা। সেখানে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাইন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলায় ১২ প্লাটুন বিজিবি, পাঁচ প্লাটুন আনসার ও আট প্লাটুন এসআরবিসহ মোট ২৫ প্লাটুন যৌথ বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সকাল ৬টা থেকেই তাঁরা মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগের দিন মঙ্গলবার ১২ প্লাটুন বিজিবি ও ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে বিজিবির পাশাপাশি আনসার ও এসআরবির সদস্যরাও মোতায়েন রয়েছেন।
এ ছাড়া গাজীপুর মহানগর পুলিশ, জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও এপিবিএনের সদস্যরা মাঠে তৎপর রয়েছেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন পয়েন্ট পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।
সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. তাহেরুল হক চৌহান বলেন, ‘আন্দোলনের নামে যেন কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানুষের জানমালের ক্ষতি না ঘটে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা সর্বোচ্চ ধৈর্য ও পেশাদারত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।’
আগের দিনগুলোতেও সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও গ্রেপ্তার
গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানার একাংশের শ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশ বক্স, পুলিশের গাড়ি ও কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষও হয়েছে। এসব ঘটনায় টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া বাংলাবাজার এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে মুঠোফোনে ভাঙচুরের দৃশ্য ধারণের সময় হামলার শিকার হয়ে তৌফিক নামের এক শ্রমিক আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আন্দোলনের নামে পুলিশ বক্স, পুলিশের গাড়ি ও কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এ পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে এবং ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

