অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থাপনায় বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি

পরিকল্পনাহীন রিসোর্ট নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ভ্রমণ; পর্যটনশিল্পের টেকসই বিকাশে জরুরি কঠোর নীতিমালা ও জবাবদিহিতা

ভ্রমণ এখন আর নিছক বিলাসিতা নয়, বরং আধুনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যান্ত্রিক নগরজীবনের ক্লান্তি কাটাতে অবসর পেলেই মানুষ ছুটছেন পাহাড়, সমুদ্র, ঝরনা কিংবা অরণ্যের সান্নিধ্যে। দেশের অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এবং সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের পরিধিও বাড়ছে। কয়েক দিনের ছুটি আর সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করার সুযোগ পেলেই অনেকে বেরিয়ে পড়ছেন ভ্রমণে।

পর্যটনের এই প্রসার দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। একই সঙ্গে হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, খাবার ও স্থানীয় সেবাভিত্তিক ব্যবসারও সম্প্রসারণ ঘটছে। তবে সম্ভাবনাময় এই খাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। পর্যাপ্ত তদারকি, পরিকল্পিত অবকাঠামো এবং কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে।

ইকো-রিসোর্টের নামে অপরিকল্পিত স্থাপনা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা ও শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে হোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা বেড়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে অনেক উদ্যোক্তা ইকো-কটেজ ও ইকো-রিসোর্ট নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন। কিন্তু এসব স্থাপনার সব ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রকৃত অর্থে ইকো-ট্যুরিজমের উদ্দেশ্য হলো পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করা। এর সঙ্গে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়গুলোও যুক্ত। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ইকো-রিসোর্টের পরিচয় কেবল নাম ও সাইনবোর্ডেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায়, খাদের কিনারে, ঝরনার পাশে কিংবা বনাঞ্চলের গভীরে অপরিকল্পিতভাবে কটেজ নির্মাণ করা হলে পর্যটক ও পরিবেশ—উভয়ই ঝুঁকিতে পড়ে। পাহাড় কাটা, গাছপালা ধ্বংস, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ে; ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও।

অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতি প্রাণঘাতী হতে পারে

পর্যটন অবকাঠামোর নিরাপত্তাহীনতার গুরুতর দৃষ্টান্ত হিসেবে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের ইনানী এলাকার ‘টুপটুপ’ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সামনে এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ জন পর্যটকের প্রাণহানি ঘটে। ঘটনাটি রিসোর্টের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটির প্রবেশ ও বের হওয়ার একমাত্র পথ ছিল রেস্তোরাঁর ভেতর দিয়ে। সেখানে জরুরি বহির্গমন পথ বা ইমার্জেন্সি এক্সিট ছিল না বলে বিভিন্ন সময়ে সেখানে অবস্থান করা পর্যটকেরা জানিয়েছেন।

রান্নাঘর থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিবেচনায় রেস্তোরাঁকে একমাত্র যাতায়াতপথ হিসেবে ব্যবহার করা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো স্থাপনায় বিকল্প বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা না থাকলে আগুনের মতো দুর্ঘটনায় প্রাণহানির আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই পর্যটনকেন্দ্রের প্রতিটি স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

পাহাড়, ঝরনা ও সমুদ্রেও ঝুঁকি

পর্যটকদের নিরাপত্তার সংকট শুধু রিসোর্টের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ি নদী, দুর্গম ঝরনা কিংবা সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গিয়ে পর্যাপ্ত সতর্কতা ও উদ্ধারব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকেরা বিপদে পড়ছেন। খৈয়াছড়া, নাফাখুম ও অমিয়াখুমের মতো দুর্গম ঝরনা এবং সিলেটের জাফলং ও বিছনাকান্দির মতো পর্যটন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা ও কার্যকর নজরদারি থাকা প্রয়োজন।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভাটার সময় লাল পতাকা বা বিপৎসংকেত উপেক্ষা করে পানিতে নামার ঘটনাও উদ্বেগজনক। সমুদ্রের স্রোত, চোরাবালি ও পানির নিচে থাকা গর্ত সম্পর্কে পর্যটকদের যথেষ্ট ধারণা না থাকলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, দৃশ্যমান সতর্কবার্তা এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে সাজেক ও থানচির মতো পাহাড়ি এলাকায় আঁকাবাঁকা ও ঢালু সড়কে অদক্ষ চালক কিংবা ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। এসব এলাকায় ব্যবহৃত ‘চাঁদের গাড়ি’সহ পর্যটক পরিবহনে নিয়োজিত যানবাহনের ফিটনেস, চালকের দক্ষতা ও নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।

পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা বিবেচনা না করে অতিরিক্ত পর্যটক প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হলে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পর্যটকের সংখ্যা, অবকাঠামোর সক্ষমতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার।

নিরাপদ পর্যটনের জন্য জরুরি পদক্ষেপ

পর্যটনশিল্পের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ বা পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিলেই চলবে না। একই সঙ্গে পর্যটকদের জীবন ও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

কঠোর নীতিমালা ও অনুমোদন: যত্রতত্র রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পর্যটন কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং কাঠামোগত নিরাপত্তার সনদ ছাড়া কোনো রিসোর্ট পরিচালনার সুযোগ থাকা উচিত নয়। পরিবেশগত ঝুঁকি ও দুর্যোগের আশঙ্কা বিবেচনা করে স্থাপনা নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করতে হবে।

পর্যটনকেন্দ্রের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ: সেন্টমার্টিন, সাজেক ও সুন্দরবনের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় প্রতিদিন কতজন পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন, তা বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা: স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসকে নিয়মিত পরিদর্শন চালাতে হবে। নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শর্ত ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে ট্যুর অপারেটরদেরও দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার: ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। পাহাড়ি সড়কে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা ও পর্যটন বিমা: দুর্গম এলাকার রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্রে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, দ্রুত উদ্ধারকারী দল এবং কার্যকর হেল্পলাইন থাকা দরকার। স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত জরুরি সাড়াদানকারী দল গড়ে তোলা গেলে দুর্ঘটনার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য উপযোগী ভ্রমণ বিমা চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

পর্যটকদেরও সচেতন হতে হবে

নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু প্রশাসন বা ব্যবসায়ীদের নয়; পর্যটকদেরও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। সতর্কতামূলক নির্দেশনা মেনে চলা, নিষিদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশ না করা, সমুদ্রে বিপৎসংকেত উপেক্ষা না করা এবং দুর্গম এলাকায় অভিজ্ঞ গাইডের সহায়তা নেওয়া জরুরি। ভ্রমণের আনন্দে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে বিরত থাকাও প্রয়োজন।

তবে পর্যটকদের সচেতনতার ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া যায় না। পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কার্যকর তদারকি অপরিহার্য। মানুষের বিনোদন ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের স্থান যেন কোনোভাবেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর তদারকি, জবাবদিহিতা এবং পর্যটকবান্ধব নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে দেশের পর্যটনশিল্প আরও টেকসই ও আস্থাশীল হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় নিরাপত্তার ঘাটতি ও ধারাবাহিক দুর্ঘটনা এই সম্ভাবনাময় খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন