জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে (জাগৃক) উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। লটারির আগে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদকে লটারির আওতার বাইরে রাখা এবং ঢাকার আকর্ষণীয় পদে পদায়ন ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর ১৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে উন্মুক্ত ও নিরপেক্ষ লটারি আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলে লটারি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরো প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়ন নিয়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৭টি। কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, পদায়ন প্রক্রিয়ায় সমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব পদকে একই লটারির আওতায় আনতে হবে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় পদকে প্রস্তাবিত লটারি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। কোন মানদণ্ডে এসব পদ আলাদা করা হয়েছে এবং এর পেছনে প্রশাসনিক কোনো যুক্তি রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তাঁদের প্রশ্ন, লটারির মাধ্যমে পদায়ন নির্ধারণই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সব অনুমোদিত পদকে একই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না কেন? এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় লটারির আগে কর্মকর্তাদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া এবং তাঁদের পছন্দের কর্মস্থল সম্পর্কে লিখিত তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারী কর্মকর্তাদের দাবি, লটারির মাধ্যমে পদায়ন নির্ধারণ করা হলে এর আগে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, কর্মকর্তাদের পছন্দ সংগ্রহ এবং পদায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও প্রকাশ করা উচিত।
একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, লটারির প্রক্রিয়াটি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকতে পারে। তাঁর ভাষ্য, “লটারি মূলত আগেই সাজানো আছে। সেটাকে বৈধ করার আনুষ্ঠানিকতা করা হয়েছে। তাছাড়া বদলির ব্যাপারে একজন পরিচালকের সঙ্গে অর্থের লেনদেনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।”
তবে ওই কর্মকর্তার অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রস্তাবিত বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ার আওতায় থাকা কয়েকজন প্রকৌশলীর বর্তমান কর্মস্থলে তিন বছর পূর্ণ হয়নি। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের পর এসব কর্মকর্তাকে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বদলির উদ্যোগ নেওয়ার প্রশাসনিক কারণ কী, তা জানতে চেয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁরা মনে করছেন, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি বিধিবিধান এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
এ ছাড়া এ বিষয়ে আগে একটি অফিস আদেশ জারি করা হলেও সেটি পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আদেশটি কেন কার্যকর হয়নি এবং বর্তমানে এর প্রশাসনিক অবস্থান কী, তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মৌখিক পরীক্ষা ও পদায়ন কমিটির সভাপতি এবং সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) হাছিনা বেগম বিস্ময় প্রকাশ করেন বলে প্রতিবেদককে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “বিষয়টি চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন, তিনি সব জানেন।”
কমিটির সভাপতির এ বক্তব্যের পর পদায়ন প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট এবং কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিচালকের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালক ফকির মুহাম্মদ মুনাওয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “ভাই, চা খেতে আসবেন। সামনাসামনি আলাপ করব।”
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য এই পর্যায়ে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পক্ষপাত বা অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। এ জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপও চেয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, ১৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে লটারির আওতা, পদায়নের মানদণ্ড, মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য এবং আগে জারি করা অফিস আদেশের বর্তমান অবস্থা প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে।
পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো তদন্ত শুরু হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

