মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

এল নিনোর তীব্রতা বাড়ছে, প্রশান্ত মহাসাগরে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড

নিনো ৩.৪ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৯.৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস; ২০২৭ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির আশঙ্কা

ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সেপ্টেম্বরে অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ‘নিনো ৩.৪’-এ গত মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৯ দশমিক ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা এ অঞ্চলে নথিভুক্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

বিশ্বের আবহাওয়ার পূর্বাভাসদাতারা কয়েক মাস ধরেই সতর্ক করে আসছেন, এবারের এল নিনো পর্যবেক্ষণকালের অন্যতম শক্তিশালী ঘটনায় পরিণত হতে পারে। বছরের শেষ দিকে এর সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকলেও তার আগেই তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।

প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোপার্নিকাসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিনো ৩.৪ অঞ্চলের সাম্প্রতিক তাপমাত্রা ১৯৮২-১৯৮৩, ১৯৯৭-১৯৯৮ এবং ২০১৫-২০১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সংস্থাটির মতে, এটি বর্তমান এল নিনোর ব্যতিক্রমী তীব্রতার ইঙ্গিত দেয়।

তবে বর্তমান এল নিনোই ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কোপার্নিকাস। সমুদ্রের সামগ্রিক তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে বেড়ে যাওয়ায় অতীতের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করাও জটিল হয়ে পড়েছে।

এল নিনো কেন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের উষ্ণ পর্যায়। এ সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এল নিনো নিজেই একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। ফলে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

কোপার্নিকাস জানিয়েছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রের দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতা বিবেচনায় নিয়ে তারা এল নিনোর তীব্রতা মূল্যায়নে নতুন একটি সূচক ব্যবহার করছে। ওই সূচক অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো এখনো অতীতের ঘটনাগুলোর তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। তবে সেপ্টেম্বরে পর্যবেক্ষণ করা তাপমাত্রা এমন একটি শক্তিশালী ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা এখনো সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়নি।

এল নিনোর তীব্রতা নির্ধারণে বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থা একই মানদণ্ড ব্যবহার করে না। এ কারণে কোনো একটি সংস্থার পর্যবেক্ষণকে এককভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।

বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাতেও রেকর্ড

এল নিনোর তীব্রতা বৃদ্ধির সময় বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রাও সেপ্টেম্বরে নতুন রেকর্ড গড়েছে। কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রেকর্ড করা আগের সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৯২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তুলনায় এটি বেশি।

সামগ্রিকভাবে গত সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্বে নথিভুক্ত দ্বিতীয় উষ্ণতম সেপ্টেম্বর। এ সময় ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন বায়ুর গড় তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

১৮৫০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত সময়কে প্রাক্‌-শিল্প যুগের গড় তাপমাত্রার ভিত্তিকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই সময়ের গড়ের তুলনায় গত সেপ্টেম্বর বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য নিয়ে উদ্বেগ

২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতারা বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্‌-শিল্প যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখার এবং তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়ে একমত হন।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাসভিত্তিক তাপমাত্রা বারবার এই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের সতর্কতা অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য কয়েক বছরের মধ্যেই অতিক্রম হয়ে যেতে পারে।

কোপার্নিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো বলেন, বিশ্ব আবার এমন একটি সময়পর্বে প্রবেশ করেছে, যখন মাসের পর মাস তাপমাত্রা প্রাক্‌-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকছে। শক্তিশালী এল নিনো আরও তীব্র হলে এ পরিস্থিতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, প্যারিস চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা সীমা অতিক্রম করার ঝুঁকি বাড়ছে। তবে ভবিষ্যতে উষ্ণতা কতটা বাড়বে এবং কত দিন তা স্থায়ী হবে, তা মানুষের নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করছে।

নিঃসরণ কমানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার ওপরে যত দীর্ঘ সময় থাকবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও তত বাড়বে। এ কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সময়কাল কমিয়ে আনা এবং যত দ্রুত সম্ভব উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, শক্তিশালী এল নিনো ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে নতুন রেকর্ডে নিয়ে যেতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে এল নিনোর তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং চলমান মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতির ওপর।

সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয় এবং একটি ঘটনা প্রায় নয় থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব পড়ে। ফলে বর্তমান এল নিনোর গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন