সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

নাফ নদীতে জেলে ‘জিম্মি’—আরাকান আর্মির বাণিজ্য

৩৯৯ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে, ফিরেছেন ২৩৪ জন; এখনও বন্দি ১৬৫

নতুন করে ৩ জেলে আটক | মুক্তিপণ দেওয়ার অভিযোগ ১৪ জেলের

নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এখন টেকনাফের জেলেদের কাছে শুধু জীবিকার উৎস নয়, আতঙ্কেরও নাম। মাছ ধরতে গিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে একের পর এক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা জেলে আটক হচ্ছেন। কেউ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যস্থতায় দেশে ফিরছেন, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুক্তিপণ দিয়ে জেলেদের ছাড়িয়ে আনার অভিযোগও উঠছে।

সর্বশেষ গত শনিবার (৮ আগস্ট) শাহপরীর দ্বীপের নাইক্ষ্যংদিয়া সংলগ্ন নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকায় মাছ ধরার সময় তিন জেলেকে একটি ট্রলারসহ ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। আটক জেলেরা হলেন জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ ইসমাইল ও হারুন। এ সময় আরও দুই জেলে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন। ঘটনার এক দিন পরও আটক তিন জেলেকে ফেরত দেওয়া হয়নি।

শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া নৌঘাট কমিটির সভাপতি আব্দুল গণি বলেন, আরাকান আর্মির সদস্যরা স্পিডবোটে এসে অস্ত্রের মুখে জেলেদের ধরে নিয়ে যায়। নাফ নদীতে পর্যাপ্ত সীমানা চিহ্ন না থাকায় স্রোত ও জোয়ার-ভাটার কারণে জেলেরা অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়েন।

তিনি বলেন, জেলেদের নিরাপত্তার জন্য নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের সংশ্লিষ্ট জলসীমায় দ্রুত বয়া ও সীমানা চিহ্ন স্থাপন করা প্রয়োজন।

তিন জেলেকে ট্রলারসহ ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী।

৩৯৯ জেলে আটক, এখনও বন্দি ১৬৫

বিজিবির ১২ মে ২০২৬ পর্যন্ত সমন্বিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকায় আরাকান আর্মি মোট ৩৯৯ জেলেকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে ২৩৪ জন দেশে ফিরেছেন। এখনও ১৬৫ জন আটক রয়েছেন।

আটক ১৬৫ জনের মধ্যে ৮১ জন বাংলাদেশি এবং ৮৪ জন রোহিঙ্গা। দেশে ফিরে আসা ২৩৪ জনের মধ্যে ১৪৩ জন বাংলাদেশি এবং ৯১ জন রোহিঙ্গা।

হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় পর্যন্ত আটক হওয়া জেলেদের প্রায় ৫৯ শতাংশ দেশে ফিরেছেন। বিপরীতে প্রায় ৪১ শতাংশ তখনও আরাকান আর্মির হেফাজতে ছিলেন।

তবে ১২ মে-র পরও নতুন করে জেলে আটকের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ৯ আগস্ট পর্যন্ত মোট কতজন জেলে আটক এবং কতজন মুক্ত হয়েছেন—তার নতুন সমন্বিত সরকারি হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি।

গত ১৮ মে চার বাংলাদেশি জেলেকে দুটি নৌকাসহ ধরে নেওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরে তাদের মধ্যে একজন সাঁতরে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এরপর ১৫ জুন নাফ নদীর মোহনা থেকে দুটি নৌকাসহ আরও সাত জেলেকে ধরে নেওয়ার খবর পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, বিজিবির ৩৯৯, ২৩৪ ও ১৬৫ জনের হিসাবটি ১২ মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রযোজ্য; পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া আটকের ঘটনাগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

মুক্তিপণের অভিযোগ

জেলেদের আটকের পাশাপাশি মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই।

গত ২৮ মার্চ নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকা থেকে ১৪ জেলেকে ধরে নেওয়ার চার দিন পর তারা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। স্থানীয় পরিবারগুলোর দাবি, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে মুক্তিপণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি বিজিবি বা স্থানীয় প্রশাসন।

এর আগে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে দেশে ফিরে আসা কয়েকজন জেলেও অভিযোগ করেছিলেন, আরাকান আর্মির সদস্যরা বাংলাদেশি মোবাইল সিম ব্যবহার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করেছিল।

তবে আটক হওয়া ২৩৪ জনের সবাই মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফিরেছেন—এমন কোনো তথ্য নেই। বিজিবির মধ্যস্থতা ও আলোচনার মাধ্যমে বহু জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার তথ্য রয়েছে।

এক বছরের বেশি সময় ধরেও বন্দি কেউ কেউ

বিজিবির হিসাবে ১৬৫ জন এখনও আরাকান আর্মির হেফাজতে রয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে এক বছরের বেশি সময় ধরে আটকে রাখার তথ্যও পাওয়া গেছে।

দেশে ফিরে আসা কয়েকজন জেলে বন্দিদশায় নির্যাতন ও অমানবিক পরিবেশে রাখার অভিযোগ করেছেন।

জেলেদের ভাষ্য, নাফ নদীর নাব্যতা, জোয়ার-ভাটা এবং জলসীমায় পর্যাপ্ত সীমানা চিহ্ন না থাকায় মাছ ধরার নৌকা অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়ে। তখনই তারা আটক হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

২০২৪ সালের শেষ দিকে মংডু ও আশপাশের এলাকায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

সীমান্তে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির উত্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব ক্রমেই বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। আরাকান আর্মির মতো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী সীমান্তবর্তী জলসীমায় সক্রিয় হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি সীমান্তকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করলে তা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তার মতে, প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবির রাখাইনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনও নাফ নদী ও সেন্টমার্টিনকে ঘিরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

সমাধান কোথায়?

জেলেদের ধারাবাহিক আটকের ঘটনা এখন শুধু বিচ্ছিন্ন সীমান্ত-ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ১২ মে পর্যন্ত ৩৯৯ জন জেলে আটক, তাদের মধ্যে ২৩৪ জনের ফিরে আসা এবং ১৬৫ জনের বন্দি থাকার তথ্যের সঙ্গে পরবর্তী নতুন আটকের ঘটনাগুলো পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিই তুলে ধরছে।

এই পরিস্থিতিতে জেলেদের নিরাপত্তায় কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • নাফ নদী ও সংশ্লিষ্ট জলসীমায় স্পষ্ট সীমানা চিহ্ন ও বয়া স্থাপন;
  • জেলেদের জন্য নিরাপদ মাছ ধরার করিডর নির্ধারণ;
  • সীমান্ত ও সমুদ্র এলাকায় নৌ-টহল বাড়ানো;
  • জেলেদের জলসীমা সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সতর্কীকরণ;
  • আটক জেলেদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ;
  • মুক্তিপণ দাবির অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া;
  • বাংলাদেশি জেলেদের জন্য জরুরি যোগাযোগ ও উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

কারণ নাফ নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া একজন জেলের কাছে এখন প্রশ্ন শুধু কত মাছ পেলেন—তা নয়; প্রশ্ন হলো, নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন তো?

তথ্যসূত্র: বিজিবির ১২ মে ২০২৬ পর্যন্ত সমন্বিত তথ্য এবং স্থানীয় প্রশাসন, জেলে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য।
তথ্য-সতর্কতা: ৩৯৯, ২৩৪ ও ১৬৫ জনের হিসাব ১২ মে ২০২৬ পর্যন্ত। এরপর মে ও জুনে নতুন আটকের ঘটনা ঘটেছে। ৯ আগস্ট পর্যন্ত নতুন সমন্বিত সরকারি সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন