মীর্জা মসিউজ্জামান
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নবনির্বাচিত সরকারের শপথগ্রহণ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণরায়ের ভিত্তিতে গঠিত এই সরকারকে ঘিরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগ্রহ স্পষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির কারণে ব্যক্তিগতভাবে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে না পারলেও দুই দেশ থেকেই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারপ্রধানের অনুপস্থিতির চেয়ে প্রতিনিধিত্বের স্তর ও বার্তাই এখানে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতের পক্ষ থেকে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিস্ত্রি শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বহুমাত্রিক। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সংযোগ অবকাঠামো ও জ্বালানি সহযোগিতায় পারস্পরিক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রয়েছে।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বিশেষ উদ্যোগবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী এহসান ইকবাল অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ–পাকিস্তান যোগাযোগেও বাস্তববাদী কূটনীতির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে শাহবাজ শরীফ অস্ট্রিয়া সফরে রয়েছেন, যেখানে তিনি বিভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমমন্ত্রী নালিন্দা জয়থসিয়া এবং নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লে. জেনারেল (অব.) বালা নন্দ শর্মার উপস্থিতির কথাও জানা গেছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যে বাণিজ্য, জলবায়ু সহনশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনগণ-জনগণ যোগাযোগে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বকে আঞ্চলিক সংহতির ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ১৭–১৯ ফেব্রুয়ারি ভারতে সফর করছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতা নিয়ে ভারত–ফ্রান্স আলোচনাও সমান্তরালে চলছে। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা আঞ্চলিক রাজনৈতিক সময়রেখাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব
নতুন সরকারের শপথকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে সংযোগ, নীল অর্থনীতি, জ্বালানি বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাসে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমবর্ধমান।
কূটনৈতিক মহলের ধারণা, নবনির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় সক্রিয় ভূমিকা অগ্রাধিকার পাবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক জোরদার, বহুপাক্ষিক মঞ্চে সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সম্পৃক্ততা—এই তিন অক্ষেই আগামী দিনের কৌশল নির্ধারিত হতে পারে।
দক্ষিণ প্লাজায় শপথগ্রহণ কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে নতুন করে তুলে ধরার এক প্রতীকী মুহূর্ত। পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই আয়োজন ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি সুদৃঢ় করার একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

