বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবির পর ঢামেক চিকিৎসকের ওপর হামলা, পরে বার্তা—‘হাউ ডু ইউ ফিল নাউ’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আসাদুর রহমানের কাছে প্রথমে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবি করে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দেওয়ার দুই দিন পর রাজধানীর শান্তিনগরে তার ওপর হামলা হয়। ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর চাঁদা দাবি করা একই নম্বর থেকে তার কাছে আবারও বার্তা আসে—‘হাউ ডু ইউ ফিল নাউ’ (এখন কেমন লাগছে?)।

হামলায় আহত ৫৫ বছর বয়সী অধ্যাপক আসাদুর রহমান বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার ডান চোখে আঘাত লেগেছে এবং চোখটি লাল হয়ে ফুলে রয়েছে।

চিকিৎসকের দাবি, চাঁদা চেয়ে পাঠানো বার্তায় চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমন’-এর নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে ওই ব্যক্তি বা তার সহযোগীরাই বার্তাগুলো পাঠিয়েছেন কিংবা হামলার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনো পুলিশ নিশ্চিত করেনি।

চাঁদা দেওয়ার সময়সীমা ছিল ১৫ আগস্ট

অধ্যাপক আসাদুর রহমান জানান, কয়েক দিন আগে তার মোবাইল ফোনে একটি বার্তা আসে। সেখানে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয় এবং অর্থ পরিশোধের জন্য ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।

প্রথম দিকে বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। তার ধারণা ছিল, কোনো ভুয়া বা প্রতারক চক্র পরিচিত কোনো অপরাধীর নাম ব্যবহার করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে।

তবে চাঁদা দেওয়ার নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিন পর তার ওপর হামলার ঘটনায় আগের বার্তাটিকে এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন তিনি।

চেম্বার থেকে ফেরার পথে হামলা

ঘটনার বর্ণনায় চিকিৎসক জানান, ১৭ আগস্ট রাতে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চেম্বার থেকে বের হয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন তিনি।

অটোরিকশাটি শান্তিনগর এলাকায় কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর চার ব্যক্তি সেটির গতিরোধ করেন। তারা অটোরিকশার দরজা খুলতে বলছিলেন।

আসাদুর রহমান চালককে দরজা না খোলার অনুরোধ করেন। তবে একপর্যায়ে দরজা খুলে দেওয়া হলে হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

‘একজনের বোনকে ভুল চিকিৎসা করেছেন’

হামলার সময় হামলাকারীরা চিকিৎসককে বলেন, তিনি তাদের একজনের বোনকে ‘ভুল চিকিৎসা’ করেছেন।

আসাদুর রহমানের ভাষ্য, তিনি ওই রোগীর পরিচয় এবং কোথায় চিকিৎসা নিয়েছিলেন, তা জানতে চান। কিন্তু হামলাকারীরা এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

এ কারণে ‘ভুল চিকিৎসা’র অভিযোগটি হামলার প্রকৃত কারণ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

হামলার ঘণ্টাখানেক পর রহস্যজনক বার্তা

ঘটনাটিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে হামলার পর পাওয়া কয়েকটি বার্তা।

আসাদুর রহমানের দাবি, হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর আগের চাঁদা দাবির একই নম্বর থেকে তার কাছে ইংরেজিতে বার্তা আসে—‘How do you feel now?’

পরদিনও ওই নম্বর থেকে আরও দুটি বার্তা এসেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। একটিতে জানতে চাওয়া হয়—‘তুমি কি আরও ঝামেলা করতে চাও?’ আরেকটিতে বলা হয়—‘তোমার কাছে কি আমরা মিডিয়ার লোকজন পাঠাব?’

চিকিৎসকের দাবি অনুযায়ী, চাঁদা দাবি, হামলা এবং হামলার পর একই নম্বর থেকে আসা এসব বার্তার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

ঘটনাস্থল থেকে একজনকে ধরে দেন স্থানীয়রা

হামলার সময় স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে একজনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। আটক ব্যক্তির নাম জীবন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

চিকিৎসক আসাদুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি কথিত ‘ভুল চিকিৎসার শিকার’ রোগী সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

চিকিৎসকের দাবি, আটক ব্যক্তি পুলিশকে জানিয়েছেন, একজন তাকে বলেছিলেন ওই চিকিৎসকের অনেক টাকা রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে গেলে তাকে একটি মোবাইল ফোন কিনে দেওয়া হবে।

আসাদুর রহমান আরও জানান, আটক ব্যক্তির বাড়িও তার নিজ এলাকা লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে।

তবে আটক ব্যক্তির এই বক্তব্যের সত্যতা এবং তাকে কারা হামলায় যুক্ত করেছিল—এসব বিষয় তদন্তাধীন।

আরেকজনকে শনাক্তের দাবি

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে আটক জীবনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে হামলায় জড়িত সন্দেহে আরও একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানা গেছে। হামলায় চারজন অংশ নিয়েছিল বলে চিকিৎসকের দাবি থাকায় অন্যদের পরিচয় শনাক্তেরও চেষ্টা করছে পুলিশ।

মামলায় চাঁদা দাবির কথা আছে, নেই ‘ডেভিড ইমন’-এর নাম

হামলার ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা করেছেন অধ্যাপক আসাদুর রহমান।

মামলার এজাহারে তার কাছে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। তবে চাঁদা দাবির বার্তায় ‘ডেভিড ইমন’-এর নাম ব্যবহারের অভিযোগ এবং হামলার পর একই নম্বর থেকে পাওয়া বার্তাগুলোর বিষয় এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি।

ফলে চিকিৎসকের পরবর্তী বক্তব্যে উঠে আসা নতুন তথ্যগুলোও তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে পূর্বশত্রুতার ধারণা

পল্টন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি পূর্বশত্রুতার জেরে ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে হামলার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তদন্তে সন্তুষ্ট নন চিকিৎসক, চান ডিবিতে হস্তান্তর

অন্যদিকে মামলার তদন্ত যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আসাদুর রহমান।

চাঁদা দাবির বার্তা, হামলার সময় দেওয়া ‘ভুল চিকিৎসা’র ব্যাখ্যা এবং হামলার পর একই নম্বর থেকে আসা হুমকিমূলক বার্তা—সবকিছু সমন্বিতভাবে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।

এ কারণে মামলাটির তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন এই চিকিৎসক।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদা দাবি ও হামলার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক কিংবা বার্তায় যার নাম ব্যবহার করা হয়েছে তার সম্পৃক্ততা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চিত করেনি। ফলে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর পেছনে কারা রয়েছে, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন