রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

জানুয়ারি-জুনে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৬.৪৩ শতাংশ


২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে বাংলাদেশ ইইউভুক্ত দেশগুলোতে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এ রপ্তানি আয় ছিল ১০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইউরো।

ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানিও ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ কমে ৪১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। অর্থাৎ ইউরোপের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমলেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

রপ্তানি কমার পেছনে পরিমাণ ও দাম—দুই চাপ

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুন সময়ে বাংলাদেশের ইউরোপমুখী পোশাক রপ্তানির চালানের পরিমাণ ৮ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে গড় রপ্তানি মূল্য কমেছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা একই সঙ্গে কম অর্ডার এবং কম দামের চাপের মুখে পড়েছেন।

এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় বাজারে যায় বলে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) জানিয়েছে।

প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের পতন বেশি

ইউরোপের পোশাক বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমলেও বাংলাদেশের পতন প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি দেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ফলে ইউরোপীয় পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশও ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে।

অন্যদিকে একই সময়ে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে পতন ছিল আরও সীমিত। ফলে বাজার সংকোচনের মধ্যেও এসব প্রতিযোগী দেশ ইউরোপের বাজারে তুলনামূলকভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।

জুনে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

তবে ছয় মাসের সামগ্রিক নেতিবাচক চিত্রের মধ্যেও জুনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। ওই মাসে রপ্তানির পরিমাণ ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ বাড়লেও গড় রপ্তানি মূল্য ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ কমেছে।

এতে বছরের প্রথমার্ধের পতন পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না হলেও জুনের প্রবৃদ্ধি বাজারে চাহিদা ফেরার সম্ভাবনার একটি সীমিত ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বৈশ্বিক চাহিদা ও প্রতিযোগিতার চাপ

ইউরোপের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা, ভোক্তাদের ব্যয়ের ধরনে পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্যসংবেদনশীলতা বড় ভূমিকা রাখছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এর পাশাপাশি চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদক দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন মূল্য, পণ্যের বৈচিত্র্য, দ্রুত সরবরাহ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের পোশাক খাত একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও কমপ্লায়েন্স ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বাড়তি পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ড পূরণের চাপ মোকাবিলা করছে।

এলডিসি উত্তরণ সামনে রেখে বাড়ছে উদ্বেগ

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ার কারণে ইউরোপীয় বাজারে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সুবিধা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ কারণে রপ্তানিকারকদের একটি অংশ মনে করছে, ইউরোপীয় ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনায় ঝুঁকি কমাতে বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিচ্ছেন।

বিজিএমইএর প্রকাশিত বিশ্লেষণেও ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো এবং এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করার প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সামনে কী করণীয়

বিশেষজ্ঞ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে শুধু কম দামে পোশাক সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্যে যেতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ, জ্বালানি ও লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

বিশেষ করে ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত অর্ডার সম্পন্ন করার সক্ষমতা এবং পণ্যের মান ও ডিজাইনে বৈচিত্র্য আনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সার্বিক চিত্র

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য বাংলাদেশের পোশাক খাতের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের মাত্রা স্পষ্ট করেছে। একদিকে ইউরোপের সামগ্রিক পোশাক বাজার সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে বাজারের গড় পতনের তুলনায় অনেক বেশি।

তবে জুনে রপ্তানি ও চালানের পরিমাণে সামান্য পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা ইউরোপের বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও তৈরি করছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সক্ষমতার ব্যবধান কমিয়ে মূল্য, গুণমান, প্রযুক্তি, স্থায়িত্ব ও দ্রুত সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন