শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

বদলে যাচ্ছে কারা অধিদপ্তরের ১৩২ বছরের পুরোনো পদ

কারা অধিদপ্তরের দীর্ঘদিনের বেশ কিছু পদের নাম ও কাঠামোতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৮৯৪ সালে প্রবর্তিত ডেপুটি জেলার পদও। প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমন্বয়, জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং একই গ্রেডের পদগুলোর নামের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে এ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কারা অধিদপ্তর থেকে চলতি মাসের শুরুতে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবে বর্তমানে কারা অধিদপ্তরের পোশাকধারী ১১টি পদ কমিয়ে ১০টি এবং পোশাকবিহীন ২৪টি পদকে পুনর্বিন্যাস করে ৯টি পদে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।

তবে প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে গত ৬ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে আবারও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

১৩২ বছরের পুরোনো ডেপুটি জেলার পদেও পরিবর্তন

কারা অধিদপ্তরের সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো ডেপুটি জেলার পদটির নাম পরিবর্তন। কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৮৯৪ সালের The Prisons Act এবং অবিভক্ত বাংলার Bengal Jail Code-এর মাধ্যমে কারাগারে জেলারকে সহায়তার জন্য ডেপুটি জেলার পদটি চালু করা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশেও পদটি কারা প্রশাসনের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে ডেপুটি জেলার এবং মহিলা ডেপুটি জেলার নামে পৃথক পদ রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী দুটি পদ একীভূত করে ‘ডেপুটি জেলার (নারী ও পুরুষ)’ করার কথা বলা হয়েছে।

এ পরিবর্তনের ফলে একই পদনামের আওতায় নারী ও পুরুষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের কাঠামো তৈরি হবে।

পোশাকধারী পদে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস

বর্তমানে কারা অধিদপ্তরে পোশাকধারী ১১টি পদ রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী এগুলোকে পুনর্বিন্যাস করে ১০টি পদে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবে—

  • সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর (মহিলা)-এর পরিবর্তে সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর;
  • সর্বপ্রধান কারারক্ষীর পরিবর্তে সর্বপ্রধান কারারক্ষী (পুরুষ);
  • চিফ মেট্রনের পরিবর্তে সর্বপ্রধান কারারক্ষী (মহিলা);
  • প্রধান কারারক্ষীর পরিবর্তে প্রধান কারারক্ষী (পুরুষ);
  • মেট্রনের পরিবর্তে প্রধান কারারক্ষী (মহিলা);
  • সহকারী প্রধান কারারক্ষীর পরিবর্তে সহকারী প্রধান কারারক্ষী (পুরুষ);
  • সহকারী মেট্রনের পরিবর্তে সহকারী প্রধান কারারক্ষী (মহিলা);
  • কারারক্ষীর পরিবর্তে কারারক্ষী (পুরুষ) এবং
  • মহিলা কারারক্ষীর পরিবর্তে কারারক্ষী (মহিলা)

নাম ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থাৎ নারী ও পুরুষ কারারক্ষীদের জন্য প্রচলিত পৃথক পদনামগুলোকে একই শ্রেণির পদ হিসেবে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মেট্রন ও চিফ মেট্রন পদেও পরিবর্তন

কারা অধিদপ্তরের পুরোনো পদগুলোর মধ্যে মেট্রন ও চিফ মেট্রন অন্যতম। প্রায় ৫৬ বছর আগে প্রবর্তিত এসব পদও পরিবর্তনের প্রস্তাবের আওতায় এসেছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী চিফ মেট্রনকে সর্বপ্রধান কারারক্ষী (মহিলা) এবং মেট্রনকে প্রধান কারারক্ষী (মহিলা) হিসেবে নামকরণের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে সহকারী মেট্রন পদকে সহকারী প্রধান কারারক্ষী (মহিলা) করার প্রস্তাব রয়েছে।

শতবর্ষী টেইলার পদও হচ্ছে ‘দর্জি’

কারা অধিদপ্তরের আরও কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী পদের নামও পরিবর্তনের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে মাস্টার দর্জি, টেইলার মাস্টার, টেইলার এবং টেইলার (মহিলা) পদগুলোকে একীভূত করে ‘দর্জি’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কারা অধিদপ্তর সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদের কিছু নাম ১০০ থেকে ১৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত রয়েছে। দীর্ঘদিনের এসব পদনামকে বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যেই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কারা শিক্ষক হচ্ছেন সহকারী শিক্ষক

প্রস্তাবিত পরিবর্তনের তালিকায় রয়েছে শিক্ষক ও কারা শিক্ষক পদও। এসব পদের নাম পরিবর্তন করে সহকারী শিক্ষক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া ক্যাশিয়ার পদের পরিবর্তে স্টোর কিপার, দপ্তরি (অফিস সহায়ক গ্রেড-১)-এর পরিবর্তে দপ্তরি, অফিস সহায়ক (গ্রেড-২)-এর পরিবর্তে অফিস সহায়ক করার প্রস্তাব রয়েছে।

মহিলা ডিপ্লোমা নার্স এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স পদ দুটির পরিবর্তে ডিপ্লোমা নার্স করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

২৪টি পোশাকবিহীন পদ কমে হচ্ছে ৯

কারা অধিদপ্তরের পোশাকবিহীন পদগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যাপক পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এমন ২৪টি পদ থাকলেও সেগুলোর নাম ও কাঠামো পরিবর্তন করে মাত্র ৯টি পদে নিয়ে আসার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মধ্যে ভ্রাম্যমাণ নিরীক্ষক এবং প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক পদ একত্র করে প্রধান সহকারী করার প্রস্তাব রয়েছে।

একইভাবে উচ্চমান সহকারী কাম লাইব্রেরিয়ান এবং সহকারী ভ্রাম্যমাণ নিরীক্ষক পদকে উচ্চমান সহকারী করার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে অফিস সহকারী, কারা সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, অফিস সহকারী কাম বিক্রেতা, সহকারী হিসাবরক্ষক, কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, কম্পিউটার অপারেটর, ডাটা এন্ট্রি অপারেটরসহ একাধিক পদকে একীভূত করে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

কেন এই পরিবর্তন?

কারা অধিদপ্তরের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা, কারা প্রশাসনকে আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা এবং একই গ্রেডের পদগুলোর মধ্যে নামের সামঞ্জস্য আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) আবুল বাশার বলেন, কারা অধিদপ্তরের নিয়োগ বিধি পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পুরোনো পদ বিলুপ্ত বা পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদেও আলোচনা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু পদের নাম পরিবর্তনের বিষয় এসেছে। এ কারণে কারা অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা অধিশাখার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা যুগ্মসচিব গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া বলেন, কারা বিধিতে কিছু পদ পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে এসেছে। এ নিয়ে গত সপ্তাহে বৈঠক হলেও এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি জানান, প্রস্তাবটি নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে আবারও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

অর্থাৎ কারা অধিদপ্তরের ১৩২ বছরের পুরোনো ডেপুটি জেলার পদসহ বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী পদনামের ভবিষ্যৎ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী বৈঠক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পরই এসব পরিবর্তন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন