শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বিমানবাহি রনতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

১৪ আগস্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর পরিবর্তে নতুন একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে লিংকনের দায়িত্ব নেওয়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি মূলত আগে থেকে পরিকল্পিত একটি রোটেশনের অংশ। তবে আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ সময় ধরে টানা মোতায়েন থাকা এবং জাহাজটির নাবিকদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগের মধ্যেই নতুন রণতরির যাত্রা শুরু হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। 

২৫০ দিনের বেশি মোতায়েন আব্রাহাম লিংকন

নিমিটজ শ্রেণির পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দীর্ঘ একটি পর্যায়ে রণতরিটি কোনো বন্দরে না থেমে সমুদ্রে অবস্থান করেছে; সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ সময়কাল ২০০ দিনের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে রণতরিটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে পরিচালিত Operation Epic Fury এবং পরবর্তী সময়ে ইরানি বন্দর ঘিরে মার্কিন নৌ-অভিযানে এর যুদ্ধবিমান ও নৌবহর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

দীর্ঘ সময়ের এই মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর জনবল ও সামরিক সম্পদের ওপরও চাপ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সক্রিয় বিমানবাহী রণতরির সংখ্যা সীমিত হওয়ায় একটি রণতরিকে দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রাখার প্রয়োজনীয়তা নৌবাহিনীর সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। 

নাবিকদের জীবনযাত্রা নিয়ে আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ

আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে তাদের জীবনযাত্রা ও মানসিক স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী প্রধানের কাছে লেখা এক চিঠিতে জাহাজটির পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন। তাঁর উত্থাপিত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মৌলিক সামগ্রীর ঘাটতি, পানির মান নিয়ে সমস্যা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেকের নিরাপত্তা এবং ডাক ও পার্সেল সরবরাহে বিঘ্ন। 

পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে জাহাজে থাকা স্বজনদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে নাবিকদের মানসিক চাপ এবং আত্মহানির আশঙ্কা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে। তবে মার্কিন নৌবাহিনী এসব পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু দাবির মাত্রা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছে। 

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং নৌবাহিনী মোতায়েন থাকা সদস্যদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন। 

নতুন রণতরির যাত্রা

ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ উপস্থিতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। নতুন দায়িত্বের কারণে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রণতরিটি ভিয়েতনাম থেকে যাত্রা করে মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগরের দিকে এগোচ্ছে। 

জর্জ ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রার ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাময়িকভাবে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরির উপস্থিতিতে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক—দুই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতির ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জকেও সামনে আনছে। 

দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে নৌবাহিনীর ওপর চাপ

আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন শুধু একটি রণতরির কার্যক্রমের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সময়ে রণতরি, নৌবহর ও প্রশিক্ষিত জনবলকে বিভিন্ন কৌশলগত অঞ্চলে মোতায়েন রাখার প্রয়োজন হওয়ায় রোটেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে উঠছে। 

তবে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের মোতায়েনকে সরাসরি আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে নির্ধারিত রোটেশনের অংশ হিসেবেই দেখছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। 

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর সিদ্ধান্ত একদিকে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে মার্কিন নৌবাহিনীর জনবল, রসদ, মানসিক স্বাস্থ্য ও অপারেশনাল প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন