নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও শ্রমিকের মজুরিতে একক ভিত্তিদর চালুর সুপারিশ; ব্যয় নজরদারিতে ব্যবহার হবে এআই
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নির্ধারণে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকারি সব প্রকৌশল সংস্থার জন্য নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণে অভিন্ন ভিত্তিদর চালুর সুপারিশ করেছে একটি সরকারি কমিটি। পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন ও বাজারদরের সামঞ্জস্য যাচাইয়ে সফটওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে সরকার।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) নির্দেশনায় গঠিত ‘সরকারি ভৌত কাজের দর তফসিল মূল্যায়নপূর্বক পুনর্নির্ধারণ কমিটি’র প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।
একক ভিত্তিদর ও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে খরচ বিশ্লেষণের অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ, অঞ্চলভিত্তিক দর সমন্বয় এবং রেট শিডিউল তৈরি ও অনুমোদনের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকী জানান, প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট রেট শিডিউল প্রস্তুত করছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারিত রেট অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করতে সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হবে।
রেট শিডিউলের আওতাভুক্ত নয়—এমন কোনো কাজের যৌক্তিকতা ও প্রকৃত বাজারমূল্য যাচাইয়ের জন্য প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিতে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশও দিয়েছে সরকার।
সাকী বলেন, সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি কেনাকাটায় যেন প্রকৃত বাজারমূল্যের প্রতিফলন ঘটে, তা নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার।
দর নির্ধারণে সংস্থাভেদে পার্থক্য দূর করার উদ্যোগ
বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি প্রকৌশল সংস্থা নিজস্ব দর তফসিল অনুসরণ করে নির্মাণকাজের ব্যয় প্রাক্কলন করে। ফলে একই ধরনের নির্মাণসামগ্রী ও কাজের ক্ষেত্রে সংস্থাভেদে দরের পার্থক্য তৈরি হয়। আবার বাজারদরের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর তফসিল হালনাগাদ না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনেও অসংগতি দেখা দেয়।
এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সব সংস্থার জন্য অভিন্ন ও সমন্বিত ভিত্তিদর এবং দর বিশ্লেষণের একক কাঠামো চালুর সুপারিশ করেছে কমিটি। এ জন্য প্রতিটি নির্মাণ উপকরণ ও কাজের আইটেমের বিপরীতে আলাদা ইউনিক কোড চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এতে একই কাজের জন্য বিভিন্ন সংস্থার আলাদা দর নির্ধারণের প্রবণতা কমবে এবং ব্যয় প্রাক্কলনে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করছে কমিটি।
তিন বছর পরপর হালনাগাদ হবে দর তফসিল
বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতি তিন বছর পরপর রেট শিডিউল হালনাগাদ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ কিংবা প্রধান নির্মাণসামগ্রীর দাম হঠাৎ অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে নির্ধারিত সময়ের আগেই দর সমন্বয়ের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
সব প্রকৌশল সংস্থা যাতে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রেট শিডিউল তৈরি, পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করতে পারে, সে জন্য সফটওয়্যারভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
অঞ্চলভেদে আলাদা দর নির্ধারণ
দেশের সব এলাকায় নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ও সরবরাহের ব্যয় সমান নয়। বিশেষ করে পার্বত্য, উপকূলীয়, দ্বীপ ও দুর্গম এলাকায় নির্মাণসামগ্রী পৌঁছাতে তুলনামূলক বেশি খরচ হয়। একটি নির্দিষ্ট দর দিয়ে সব এলাকার প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্য পুরোপুরি সমন্বয় করা সম্ভব নয়। এ কারণে অঞ্চলভেদে দর নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আধুনিক নির্মাণপদ্ধতি, প্রি-ফেব্রিকেটেড সামগ্রী এবং পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যও রেট শিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত
নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির পেছনে শুল্ক ও কর, পরিবহন খরচ, পরিবহন খাতে কথিত চাঁদাবাজি, মধ্যস্বত্বভোগী আমদানিকারকদের কারসাজি এবং কিছু ব্যবসায়ীর বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে রড, পাথর ও বিটুমিনের ওপর আরোপিত কর ও শুল্কের পাশাপাশি ঠিকাদারি কাজের ভ্যাট ও কর কাঠামো পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
খরচ কমাতে ভারী নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে সড়কপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও অনিয়ম রোধে কঠোর নজরদারির কথাও বলা হয়েছে।
খাতভিত্তিক রেট শিডিউল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে প্রকৌশল সংস্থাগুলোর দায়িত্ব আরও সুনির্দিষ্ট করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
ছয় মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম তিন মাসের মধ্যে সমন্বিত ভিত্তিদর ও ব্যয় বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনুমোদন করা হবে। পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে প্রকৌশল সংস্থাগুলো তাদের নিজ নিজ রেট শিডিউল হালনাগাদ করবে।
কমিটির আশা, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনে বিদ্যমান অসংগতি কমবে এবং সরকারি নির্মাণকাজের প্রাক্কলিত দর প্রকৃত বাজারমূল্যের কাছাকাছি আসবে।

