ভালো চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় নিয়ে পাসপোর্ট কেড়ে বন্দিদশায় রেখে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার অভিযোগ, মুক্তিপণও আদায়
কম্বোডিয়ায় ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দুই বাংলাদেশি তরুণকে মানবপাচারের অভিযোগে চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে দুই তরুণের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারের বিনিময়ে একটি স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করা হয়। সেখানে তাঁদের জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কাজে নিয়োজিত করা এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে ঢাকা মহানগরীর পল্টন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে সিআইডির একটি দল।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন গাজীপুরের পূবাইল থানার বড়দল গ্রামের মো. শাওন মোল্লা (২৩) এবং নয়ানিপাড়া গ্রামের মো. সাকিব সরকার (২৬)।
ভালো চাকরির আশায় বিদেশযাত্রা, পরিণতি বন্দিদশা
সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, আর্থিকভাবে সচ্ছল জীবনের আশায় মানবপাচার চক্রের প্রলোভনে পড়ে কম্বোডিয়ায় যান দুই বাংলাদেশি তরুণ। বিদেশে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁদের স্বজনদের। এ জন্য প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়।
তবে কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে যাওয়ার পরপরই তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। পরে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারের বিনিময়ে তাঁদের একটি স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
সেখানে তাঁদের জোরপূর্বক অনলাইনে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা সামান্য ভুল করলেও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নিজেদের ইচ্ছায় ওই স্থান থেকে বেরিয়ে আসা কিংবা নিরাপদে দেশে ফেরার সুযোগও তাঁদের ছিল না।
মুক্তির জন্য পাঁচ হাজার ডলার মুক্তিপণ
একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন ভুক্তভোগী দুই তরুণ। এরপর তাঁদের মুক্তির জন্য স্ক্যাম সেন্টার থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। সন্তানদের মুক্তির আশায় পরিবারের সদস্যরা ওই অর্থের ব্যবস্থা করেন।
তবে মুক্তি পাওয়ার পরও তাঁদের দুর্ভোগ শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে সিআইডি। অভিযোগ অনুযায়ী, মুক্তির পর মানবপাচারকারীরা আবারও তাঁদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। দেশে ফেরার টিকিটের খরচও পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয়।
বিদেশে পাঠানোর খরচ, মুক্তিপণ ও দেশে ফেরার টিকিটের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।
দুই মাস হোটেলে অবস্থানের পর দেশে ফেরা
পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগী দুই তরুণ প্রায় দুই মাস কম্বোডিয়ার একটি স্থানীয় হোটেলে অবস্থান করতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে অনলাইনের মাধ্যমে তাঁরা ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রয়োজনীয় সহায়তায় তাঁদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়।
দীর্ঘদিনের বন্দিদশা, নির্যাতন ও অনিশ্চয়তার পর গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তাঁরা বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
মামলার পর অভিযানে গ্রেপ্তার দুই আসামি
সিআইডি জানায়, এ ঘটনায় ২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পল্টন থানায় মামলা করা হয়। মামলাটি মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৬, ৭, ৮, ৯ ও ২২ ধারায় রুজু করা হয়েছে।
মামলার অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে মামলার এজাহারনামীয় আসামি শাওন মোল্লা ও সাকিব সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মামলার তদন্তও চলমান বলে জানিয়েছে সিআইডি।
বিষয়টি নিয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

