রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ, শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা

অর্থনীতি ডেস্ক । ২৪ অক্টোবর ২০২৬

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ধরে রাখা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা থাকলেও প্রস্তুতির জন্য আরও তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘে আবেদন করেছে সরকার। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে দেশটি।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। তবে চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানায়। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) শর্তসাপেক্ষে সময় বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়।

সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যেই এলডিসি উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় চাইছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধা ভোগ করছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) ব্যবস্থার আওতায় অস্ত্র ছাড়া প্রায় সব ধরনের পণ্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্তভাবে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।

এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বিদ্যমান ইবিএ সুবিধা আরও তিন বছর বহাল থাকার বিধান রয়েছে। তবে এই সময়সীমা শেষ হলে বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইবিএ সুবিধা থেকে সাধারণ জিএসপি ব্যবস্থায় গেলে বাংলাদেশের অধিকাংশ তৈরি পোশাক পণ্যে প্রায় ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাব পড়তে পারে। তবে জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জন করা সম্ভব হলে এই ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২০২০ সালের প্রক্ষেপণ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এলডিসি-সংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা হারানোর ফলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমতে পারে। ওই সময়ের রপ্তানি ভিত্তি অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা হয়েছিল প্রায় ৫৩৭ কোটি মার্কিন ডলার।

তবে এটি পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি গবেষণামূলক প্রক্ষেপণ। বর্তমান রপ্তানি আয়, নতুন বাণিজ্যচুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।

রপ্তানি খাতে সম্ভাব্য চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি ও অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা বজায় রাখার উদ্যোগ জোরদার করেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট সাম্প্রতিক আলোচনায় জানানো হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে উত্তরণের পরও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ এসব সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সমঝোতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আগে থেকেই নিয়মিত আমদানি শুল্কের আওতায় রয়েছে। ফলে এলডিসি উত্তরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন করে একই ধরনের শুল্কসুবিধা হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হবে না। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় ও বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কসুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশি পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানি, পণ্য পরিবহন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, শিপিং ও বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ প্রতিযোগী রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে বাজার ধরে রাখার লড়াইয়ে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মান, সরবরাহের সময় এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জন, নতুন মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

একই সঙ্গে শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, সুশাসন, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো এলডিসি-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তবে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান সুবিধা ধরে রাখা এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করাই হবে দেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন জাতিসংঘের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নতুন বাণিজ্যচুক্তি, নীতিগত সংস্কার এবং রপ্তানিকারকদের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন