ক্রয়াদেশ কমার আশঙ্কা, সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি রপ্তানিকারকদের; ভারত-ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
ফ্রান্স, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় ইউরোপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে, যার প্রভাব পড়তে পারে পোশাকের চাহিদা ও ক্রয়াদেশে।
এর মধ্যে সুতা আমদানিতে সরকারের সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের ভাষ্য, ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন বাড়তি দাম দিতে অনাগ্রহী; বরং অনেক ক্ষেত্রে পোশাকের দাম আরও কমানোর চাপ দিচ্ছেন। একই সময়ে শ্রমিকদের নতুন করে মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের অপেক্ষা থাকায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
রপ্তানিকারকদের আরেকটি বড় শঙ্কা হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পেলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা আরও কমতে পারে।
বিক্ষোভের প্রভাব পড়ছে ক্রয়াদেশে
নারায়ণগঞ্জভিত্তিক নিট পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফতুল্লা ফ্যাশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে শামীম এহসান গতকাল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ফ্রান্সের একজন বড় ক্রেতা সোমবার তাঁদের একটি ক্রয়াদেশ আপাতত স্থগিত রাখতে বলেছেন। যদিও এর আগে দুই পক্ষের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি এহসান বলেন, ফরাসি ক্রেতার আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভে দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি তৈরি পোশাকের চাহিদাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ এ অঞ্চলে যায়। ফলে ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। সেখানে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিলে এবং তা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিক্ষোভের চেয়ে অর্থনৈতিক মন্দা বড় কারণ?
তবে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম মনে করেন, ইউরোপে ক্রয়াদেশ কমার প্রধান কারণ বিক্ষোভ নয়, বরং অঞ্চলটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও ক্রয়াদেশ কমছে। তবে ইউরোপের বাজারে পরিস্থিতি আরও খারাপ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ২৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ আবারও ইউরোপের বাজারে নিজেদের হিস্যা ফিরে পেতে শুরু করেছে।
শোভন ইসলামের মতে, শুধু বিক্ষোভের কারণে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই। তাঁর ধারণা, বিক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ীও হবে না।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, আবাসন ব্যয় বহনের সক্ষমতা, শিক্ষা ও সরকারি সেবা নিয়ে অসন্তোষের জেরে ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে, ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত ইউরোপীয় কমিশনের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৫ সালে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস ইউরোপের অর্থনৈতিক গতি মন্থর হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরে। তবে বিক্ষোভের কারণে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে কী পরিমাণ প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে অস্থিরতার স্থায়িত্ব, ভোক্তা চাহিদা এবং ক্রেতাদের ক্রয়াদেশের ওপর।
সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধে বাড়ছে ব্যয়ের চাপ
দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে সুরক্ষা দিতে নিট পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করেছে সরকার।
সংশোধিত ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের আমদানি করা সুতার মূল্যের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। ওই সুতা দিয়ে তৈরি পণ্য রপ্তানি এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক নথিপত্র জমা দেওয়ার পর ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা যাবে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের দাবি, এ ব্যবস্থা কার্যত একটি অশুল্ক বাধা হিসেবে কাজ করছে। এতে প্রস্তুতকারকেরা তুলনামূলক বেশি দামের দেশীয় সুতা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন। ইউরোপের বাজারে ক্রয়াদেশ কমার পরিস্থিতিতে এই বাড়তি ব্যয় ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
ফকির ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ বলেন, আমদানি করা প্রতি কেজি ৩০ কাউন্টের কম্বড সুতার দাম ৩ দশমিক ১৫ ডলার। অথচ দেশের বাজারে একই ধরনের সুতার দাম প্রতি কেজি ৩ দশমিক ৭৫ ডলার।
তিনি বলেন, দেশীয় সুতা ব্যবহারে বাধ্য করা হলে প্রতি পিস পোশাকের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৫ সেন্ট বাড়বে। কিন্তু ইউরোপের অধিকাংশ ক্রেতা জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এক সেন্টও বাড়তি দাম দিতে রাজি নন।
নাহিদের মতে, এতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা আরও কমবে।
ভারত-ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
নাহিদ বলেন, জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে চাপে ফেলছে।
এ পরিস্থিতিতে আগামী এক মাসকে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি সুতা আমদানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ সময়ের মধ্যে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার না করা হলে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা থাকা কিছু ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যেতে পারে।
রপ্তানিকারকদের মতে, ইউরোপের বাজারে চাহিদার অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ, সম্ভাব্য মজুরি বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের বাড়তি ব্যয়—সব মিলিয়ে পোশাকশিল্প একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখা খাতটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

