বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো পুনর্বিন্যাস করে ছয় লেনের সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ

বিআরটি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণের চিন্তা, দুই উড়ালসড়ক চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ; প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতার পর সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত

ঢাকা-গাজীপুর করিডরে যান চলাচল সহজ, দ্রুত ও নির্বিঘ্ন করতে বিদ্যমান বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের অবকাঠামো পুনর্বিন্যাস করে সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় করিডরের উভয় পাশে সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য তিনটি করে লেন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিআরটি স্টেশন, লেন বিভাজক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো অপসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি বিদ্যমান দুই লেনের দুটি উড়ালসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘদিনের বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন জটিলতায় আটকে থাকা বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক বিকল্প বিবেচনার পর সরকার শেষ পর্যন্ত করিডরটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সোমবার জারি করা এক চিঠি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রোববার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।

বিলুপ্ত হচ্ছে ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি

মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বিলুপ্ত করে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রাথমিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতির হালনাগাদ তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বাসসকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁরা অবগত হয়েছেন এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রাথমিক অগ্রগতি প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে সরকারের নির্দেশনা অনুসারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি বিআরটি প্রকল্প

ঢাকা-গাজীপুর করিডরে দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে ২০১২ সালের নভেম্বরে ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৭ দশমিক ৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি কয়েক দফা সংশোধন করা হয়। এতে প্রাক্কলিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ দশমিক ৩২ কোটি টাকায়। প্রকল্পে অর্থায়ন করে বাংলাদেশ সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং ফ্রান্সের উন্নয়ন সংস্থা এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য দেভেলপমঁ (এএফডি)।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটির অবকাঠামোগত কাজের প্রায় ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছিল। তবে সার্বিক বাস্তব অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও তা আর বাড়ানো হয়নি।

অবকাঠামো তৈরি হলেও চালু হয়নি পরিকল্পিত বিআরটি সেবা

বিআরটি প্রকল্পের আওতায় নির্মিত পৃথক লেন পরবর্তী সময়ে সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তবে পরিকল্পিত বিআরটি সেবা চালুর জন্য বাস কেনার দুটি উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় নির্ধারিত ব্যবস্থায় যাত্রী পরিবহন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত করা—বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একদিকে অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, অন্যদিকে প্রত্যাশিত গণপরিবহন সেবা চালু করা যায়নি।

পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার।

ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান একনেকের

২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বিআরটি প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

একই সঙ্গে প্রকল্পটির নকশা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর সরকার প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চারটি বিকল্প বিবেচনা করে।

বিকল্পগুলো ছিল—বিআরটি প্রকল্পের কাজ শেষ করা, রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং পদ্ধতিতে বাস চালু করা, করিডরকে টোলভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা অথবা সাধারণ মহাসড়কে পরিণত করা। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের বিকল্পটি বেছে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরেও অন্তর্বর্তী সরকার অতিরিক্ত সময় ও অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ঢাকা-গাজীপুর রুটে বিআরটি সেবা চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

নকশা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল বুয়েটের পর্যালোচনায়

প্রকল্পটির নকশা ও কার্যকারিতা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি পর্যালোচনা দল বিআরটি প্রকল্পের নকশাগত ত্রুটি ও সীমিত সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে এ সেবা চালুর পরিকল্পনা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।

দলটি নতুন করে বিনিয়োগ না করে বিদ্যমান অবকাঠামো সাধারণ যানবাহন চলাচলে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সেই বিকল্পের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

তবে অবকাঠামো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সড়কের ধারণক্ষমতা বাড়ানো গেলেও করিডরে দীর্ঘমেয়াদে যানজট কমানো এবং যাত্রীদের যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনার বিষয়টি নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর।

সিদ্ধান্ত নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের উদ্বেগ

সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এ সিদ্ধান্তকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।

সংগঠনটির মতে, ছয় লেনের সাধারণ সড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা গাজীপুর পরিবহন মহাপরিকল্পনা এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিআইপির আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারকে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন নির্মাণকাজের কারণে ভোগান্তিতে থাকা গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের গণপরিবহনের চাহিদাও যথাযথভাবে পূরণ নাও হতে পারে।

যানজট নিরসন ও গণপরিবহনের ভারসাম্যই বড় চ্যালেঞ্জ

ঢাকা-গাজীপুর করিডর রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য যাত্রী এ পথে চলাচল করেন। ফলে এ করিডরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিনের বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন জটিলতার পর বিআরটি অবকাঠামো পুনর্বিন্যাস করে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখন বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার, যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা এবং গণপরিবহনের সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রকল্পটির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ছয় লেনের সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বাস চলাচল ও গণপরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। কারণ, শুধু সড়কের লেন বাড়ানো নয়, ব্যক্তিগত ও গণপরিবহনের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং যাত্রীদের জন্য নির্ভরযোগ্য যাতায়াত নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদে এ করিডরের যানজট কমানোর ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে উঠবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন