দুইবার সমতা ফেরালেও শেষ রক্ষা হয়নি বার্সেলোনার, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা তিন জয়ে শীর্ষে শিরোপাধারীরা
প্রথমার্ধে আক্রমণে একচেটিয়া আধিপত্য দেখিয়ে এগিয়ে যায় প্যারিস সাঁ জার্মেই (পিএসজি)। বিরতির পর ঘুরে দাঁড়িয়ে দুইবার সমতা ফেরায় বার্সেলোনা। তবে শেষ দিকে আর পেরে ওঠেনি স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়নরা। শেষ মুহূর্তের দুই গোলে জয় নিশ্চিত করে লুইস এনরিকের দল।
মঙ্গলবার রাতে প্যারিসে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের জমজমাট ম্যাচে বার্সেলোনাকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে বর্তমান শিরোপাধারী পিএসজি। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত বার্সেলোনার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল ম্যাচটি। এ হারে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ১১ ম্যাচ জয়ের পর মৌসুমে প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পেল কাতালান ক্লাবটি।
পিএসজির হয়ে দেজিরে দুয়ে, ভিতিনিয়া, ফাবিয়ান রুইস ও লুকাস এরনঁদেজ গোল করেন। বার্সেলোনার হয়ে জালের দেখা পান শাভি এস্পার্ত ও লামিন ইয়ামাল। গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়ার একাধিক দুর্দান্ত সেভও শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনাকে পরাজয় থেকে বাঁচাতে পারেনি।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পয়েন্ট তালিকা
এ জয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তিন ম্যাচে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে পিএসজি। সমান পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে লিভারপুল। অন্যদিকে, আরও সাতটি দলের সঙ্গে সমান ৬ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার ছয় নম্বরে রয়েছে বার্সেলোনা।
প্রথমার্ধে পিএসজির আধিপত্য
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে পিএসজি। দ্বিতীয় মিনিটে নিজেদের বক্সের বাইরে বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপদে পড়েন বার্সেলোনার পেদ্রি। সেখান থেকে খাভিচা কাভারাৎস্খেলিয়ার নিচু শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বল উসমান দেম্বেলে জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে তা কার্যকর হয়নি।
পঞ্চম মিনিটে বক্সে ঢুকে দেম্বেলের নেওয়া নিচু শট আটকে দেন বার্সেলোনার গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়া। কয়েক সেকেন্ড পর দেজিরে দুয়ের শটও ফিরিয়ে দেন তিনি। সপ্তম মিনিটে প্রথমবার পিএসজির বক্সে ঢোকার সুযোগ পায় বার্সেলোনা। তবে পেদ্রির শট প্রতিপক্ষের রক্ষণে আটকে যায়।
১৯তম মিনিটে চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন দেম্বেলে। তার পরিবর্তে নামেন ফেররান তরেস। ২৫তম মিনিটে ওয়ান-অন-ওয়ানে তরেসের শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন গার্সিয়া। পরের মিনিটে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন বার্সেলোনার ফরোয়ার্ড দানি ওলমো।
২৯তম মিনিটে আবারও গার্সিয়ার অসাধারণ দক্ষতায় গোল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় পিএসজি। ফাবিয়ান রুইসের পাস থেকে ফেররান তরেসের শট ফিরিয়ে দেন তিনি। ফিরতি বলে রুইসের দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ঠেকিয়ে দেন বার্সেলোনার গোলরক্ষক।
তবে ৩৮তম মিনিটে আর রক্ষা হয়নি বার্সেলোনার। নিজেদের অর্ধে বলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সতীর্থের কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শটে পিএসজিকে এগিয়ে দেন দুয়ে। তার শট ঠেকাতে পারেননি গার্সিয়া।
দুই মিনিট পর সমতায় ফেরার সুযোগ পেয়েছিল বার্সেলোনা। পেদ্রির পাস ধরে বক্সে ঢুকে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে পাঠানোর চেষ্টা করেন ফের্মিন লোপেস। তবে তার প্রচেষ্টা রুখে দেন মাতভেই সাফানভ। ফিরতি বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে পিএসজির ডিফেন্ডার উইলিয়ান পাচোও আঘাত পান।
প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে কাভারাৎস্খেলিয়ার জোরালো শট ঠেকিয়ে আরও একবার বার্সেলোনাকে রক্ষা করেন গার্সিয়া। তবু বিরতিতে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকে কাতালান দলটি।
বিরতির পর বার্সেলোনার প্রত্যাবর্তন
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও পিএসজির আক্রমণ অব্যাহত থাকে। ৫১তম মিনিটে আশরাফ হাকিমির কাছ থেকে পাওয়া সুযোগে কাছ থেকে শট নেন এক পিএসজি খেলোয়াড়, তবে পা দিয়ে বল আটকে দেন গার্সিয়া।
৫৫তম মিনিটে ম্যাচে সমতা ফেরায় বার্সেলোনা। ফের্মিন লোপেসের পাস ধরে বক্সে ঢুকে কাছের পোস্ট দিয়ে জোরালো শটে গোল করেন শাভি এস্পার্ত। গোলরক্ষক বল স্পর্শ করলেও তা আটকাতে পারেননি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১৯ বছর বয়সী এই ফুটবলারের এটি প্রথম গোল।
দুই মিনিট পর আবারও সুযোগ পায় বার্সেলোনা। তবে বক্সে ঢুকে রাফিনিয়ার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন আনেন বার্সেলোনা কোচ। রাফিনিয়া, পেদ্রি ও মার্ক বের্নালের বদলে মাঠে নামেন কারিম আডেইয়েমি, গাভি ও রদ্রি। অন্যদিকে চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন কাভারাৎস্খেলিয়া।
মাঠে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই সুযোগ পেয়েছিলেন গাভি। ইয়ামালের পাস থেকে তার নেওয়া শট আটকে দেন পিএসজির গোলরক্ষক। অন্যদিকে, ৭১তম মিনিটে হাকিমির পাস থেকে গোলের সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেননি ফেররান তরেস। তার শট পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়।
এরপর কর্নার থেকে হেডে পিএসজিকে আবার এগিয়ে দেন লুকাস এরনঁদেজ। ফলে ম্যাচের শেষ দিকে ২-১ গোলে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা।
ইয়ামালের গোলে সমতা, শেষ দিকে পিএসজির ঝড়
৭৯তম মিনিটে দুর্দান্ত এক গোলে আবারও বার্সেলোনাকে সমতায় ফেরান ইয়ামাল। পিএসজির অর্ধে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুল করেন ওয়ারেন জাইরে-এমেরি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন ইয়ামাল। ডান দিক দিয়ে দ্রুত এগিয়ে বক্সে ঢুকে কঠিন কোণ থেকে বাঁ পায়ের শটে কাছের পোস্ট দিয়ে জালে বল পাঠান তিনি।
তবে বার্সেলোনার স্বস্তি স্থায়ী হয় মাত্র দুই মিনিট। ৮১তম মিনিটে প্রতিপক্ষের ক্লিয়ার করা বল বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে ডান পায়ের জোরালো শটে গোল করেন ভিতিনিয়া। এতে তৃতীয়বারের মতো লিড নেয় পিএসজি।
৮৬তম মিনিটে ব্যবধান আরও বাড়ান ফাবিয়ান রুইস। ডান দিক থেকে হাকিমির পাস পেয়ে দূরের পোস্টে ছুটে গিয়ে ফাঁকা জালে বল পাঠান স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। তার গোলে ৪-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পিএসজি। শেষ পর্যন্ত এ ব্যবধানেই জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্বাগতিকরা।
পরিসংখ্যানে পিএসজির এগিয়ে থাকা
পুরো ম্যাচে গোলের জন্য ২২টি শট নেয় পিএসজি, যার ১৫টি ছিল লক্ষ্যে। প্রথমার্ধে আটটিসহ মোট ১০টি সেভ করেন বার্সেলোনার গোলরক্ষক গার্সিয়া। অন্যদিকে, বল দখলে কিছুটা এগিয়ে থাকা বার্সেলোনা ১৮টি শট নেয়, যার পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে।
বার্সেলোনার দুই ডিফেন্ডার জুল কুন্দে ও এরিক গার্সিয়া চোটের কারণে এ ম্যাচে খেলতে পারেননি। মৌসুমের সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১২ ম্যাচে এই প্রথম পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় দলটি। শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও পিএসজির আক্রমণ সামলাতে পারেনি তারা।
এল ক্লাসিকোর আগে ধাক্কা বার্সেলোনার
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এ পরাজয়ের পর বার্সেলোনার সামনে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ। আগামী রোববার লা লিগায় মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রেয়াল মাদ্রিদের মুখোমুখি হবে দলটি। গুরুত্বপূর্ণ সেই ম্যাচের আগে পিএসজির কাছে হার বার্সেলোনার আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, টানা তিন জয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করল পিএসজি। শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে লুইস এনরিকের দল যে শুরু থেকেই নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিচ্ছে, বার্সেলোনার বিপক্ষে এ জয় তারই আরেকটি প্রমাণ।

