এক বছরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ৩০ শতাংশ, বিদেশে বাংলাদেশিদের ব্যয় প্রায় চার গুণ
দেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ও লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে। চলতি বছরের আগস্টে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৮৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৩০ দশমিক ০৩ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের আগস্টে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। তবে মাসভিত্তিক হিসাবে গত জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে লেনদেন কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। জুলাইয়ে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ার পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য। আগস্টে বাংলাদেশে ইস্যু করা ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে প্রায় ৯৮৭ কোটি টাকা খরচ করেছেন বাংলাদেশিরা। বিপরীতে, বিদেশে ইস্যু করা কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে লেনদেন হয়েছে প্রায় ২৪৯ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বিদেশি কার্ডধারীরা বাংলাদেশে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন, তার প্রায় চার গুণ অর্থ বিদেশে খরচ করেছেন বাংলাদেশি কার্ডধারীরা।
পাঁচ বছরে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৬ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ইস্যু করা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। একই সময়ে এসব কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের মোট পরিমাণ বেড়েছে ১০৩ শতাংশ।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪২ লাখ, ক্রেডিট কার্ড ১৭ লাখ ৬২ হাজার এবং প্রিপেইড কার্ড ১০ লাখ ২৬ হাজার। সব মিলিয়ে তখন কার্ডের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ।
২০২৬ সালের আগস্টে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ১ লাখে। ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা হয়েছে ২৮ লাখ ৫ হাজার এবং প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ৯২ লাখ ৭০ হাজার। এতে তিন ধরনের কার্ডের সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ কোটি ২৯ লাখ।
এই পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা, ৮০৩ শতাংশ। একই সময়ে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ। তবে সংখ্যার দিক থেকে এখনো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ডেবিট কার্ড।
কার্ডে লেনদেন ৪৯ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা
পাঁচ বছরে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের মোট পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ২৪ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭৭০ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের প্রবণতাও জোরদার হচ্ছে।
প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ভোক্তাদের লেনদেনব্যবস্থায় নগদ অর্থের প্রাধান্য রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগদ লেনদেনের প্রচলন ধারাবাহিকভাবে কমছে।
ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে লেনদেনের ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় একাধিক সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে ক্রেডিট কার্ডের প্রায় অর্ধেক লেনদেন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে
আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে। এ খাতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা, যা দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেনের ৪৮ দশমিক ১৪ শতাংশ।
আগের মাস জুলাইয়ে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা ওই মাসের মোট লেনদেনের ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটা, ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন প্রচারমূলক অফার এবং ক্রেডিট কার্ড গ্রহণের সুযোগ বাড়ার কারণে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে কার্ডের ব্যবহার বেশি হতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য কারণ; পৃথক কোনো পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে কারণগুলো নিশ্চিত করা হয়নি।
আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেনের ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়। নগদ অর্থ উত্তোলনের অংশ ছিল ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং তহবিল স্থানান্তরের অংশ ছিল শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডের প্রধান ব্যবহার এখনো কেনাকাটা ও সেবা গ্রহণকেন্দ্রিক।
বিদেশে বাংলাদেশিদের ব্যয় ৯৮৭ কোটি টাকা
আগস্টে বাংলাদেশে ইস্যু করা ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে মোট ৯৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বাংলাদেশিরা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫০৫ কোটি, ডেবিট কার্ডে ৪২২ কোটি এবং প্রিপেইড কার্ডে ৬০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ জুলাইয়ের তুলনায় কমেছে। জুলাইয়ে এ ধরনের কার্ডে বিদেশে লেনদেন হয়েছিল ৫২৬ কোটি টাকা, যা আগস্টে কমে ৫০৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। লেনদেনের সংখ্যাও জুলাইয়ের ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৬টি থেকে কমে আগস্টে ৮ লাখ ২৩ হাজার ১৫০টিতে নেমেছে।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে, যা মোট ব্যয়ের ৩০ দশমিক ২৯ শতাংশ। এরপর খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, পরিবহন খাতে ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং ওষুধ ও ফার্মেসিতে ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়িক সেবা, পোশাক কেনাকাটা, সরকারি ও পেশাগত সেবা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ এবং নগদ অর্থ উত্তোলনেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশিরা।
দেশভিত্তিক হিসাবে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, মোট ব্যয়ের ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর থাইল্যান্ডে ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ভারতে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
বিদেশে ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহারও বেড়েছে
বিদেশে ডেবিট কার্ডে লেনদেন জুলাইয়ের ৪০১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগস্টে ৪২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এরপর সরকারি সেবায় ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ, ব্যবসায়িক সেবায় ১৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং নগদ অর্থ উত্তোলনে ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে বিদেশে ডেবিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে যুক্তরাজ্যে, যা মোট ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং ভারতে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ব্যয় করেছেন বাংলাদেশি কার্ডধারীরা।
অন্যদিকে, বিদেশে প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনও বেড়েছে। জুলাইয়ে এ ধরনের কার্ডে ৫৮ কোটি টাকা খরচ হলেও আগস্টে তা বেড়ে ৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
প্রিপেইড কার্ডে সবচেয়ে বেশি ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে সরকারি সেবায়। এরপর নগদ অর্থ উত্তোলনে ১৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং ব্যবসায়িক সেবায় ১৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে প্রিপেইড কার্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ভারতে, মোট ব্যয়ের ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ, সৌদি আরবে ১০ দশমিক ২১ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডে লেনদেন বেড়েছে
আগস্টে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে ২৪৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ২৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে বিদেশি কার্ডে বাংলাদেশে লেনদেন বেড়েছে ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি ৩৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এরপর নগদ অর্থ উত্তোলনে ২৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ, পরিবহন খাতে ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং পোশাকের দোকানে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডের লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ইস্যু করা কার্ডের, ২১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এরপর যুক্তরাজ্যে ইস্যু করা কার্ডের অংশ ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ভারতে ইস্যু করা কার্ডের অংশ ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
ক্রেডিট কার্ডে বকেয়া ঋণ ১৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে দেশের ৪৭টি তফসিলি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের সম্মিলিত অনুমোদিত ঋণসীমা ছিল ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ডধারীদের বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
নগদবিহীন লেনদেনে এখনো প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশে নগদবিহীন লেনদেনের প্রসারে এখনো বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে নগদ অর্থনির্ভর অর্থনীতি, ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব, লেনদেনের খরচ এবং স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, কার্ডের ব্যবহার বাড়লে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার হওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণেও সহায়তা মিলতে পারে। তবে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের প্রসারের সঙ্গে জালিয়াতি প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করা, গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

