বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন খেলাপি ঋণের অন্যতম কারণ: বিআইবিএম

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের পেছনে দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, ঋণ অনুমোদনে সুশাসনের ঘাটতি এবং খেলাপি ঋণ শনাক্ত করতে বিলম্বকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)।

বিআইবিএমের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ কমাতে নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, ঋণ বিতরণের পর কার্যকর তদারকি এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে গবেষণায়।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ: নীতিগত প্রত্যাশা ও বাজারের বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় গবেষণার এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে বিআইবিএমের গবেষক, শিক্ষাবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, গবেষণায় ঋণ মূল্যায়নের মান, ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা, ঋণ বিতরণের পর তদারকি এবং ঋণ পুনর্গঠন ও আদায় প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হারকে একটি উপসর্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পেছনের কারণ চিহ্নিত করে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার বের করা প্রয়োজন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ঋণ মূল্যায়নের সময় প্রায়ই যথাযথভাবে নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ করা হয় না। এছাড়া ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা শিল্প ও খাতভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেন।

গবেষণাপত্রে জামানতনির্ভর ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে ঋণগ্রহীতার নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ভিত্তিতে ঋণ মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

ঋণ বিতরণের পর অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, নির্ভরযোগ্য নগদ প্রবাহসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়মিতভাবে ঋণগ্রহীতার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। কিস্তি বকেয়া পড়া, অস্বাভাবিক লেনদেন, নগদ প্রবাহ কমে যাওয়া, ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া এবং ঋণগ্রহীতার ঝুঁকির মান অবনতি হওয়াকে আগাম সতর্কসংকেত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ, ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ এবং ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মানসংক্রান্ত সূচক ভালো দেখানোর প্রবণতা খেলাপি ঋণ স্বীকৃতিতে বিলম্বের কারণ হতে পারে। তাই যথাসময়ে খেলাপি ঋণ শনাক্ত ও স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়াকে বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আর ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক নীতিতে শিথিলতা বা বারবার নীতিগত হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে ঋণ শৃঙ্খলা দুর্বল করে।

তবে গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এসব ফলাফল উত্তরদাতাদের অভিমত ও উপলব্ধির প্রতিফলন। এগুলো পুরো ব্যাংকিং খাতে সংশ্লিষ্ট সমস্যার প্রকৃত ব্যাপকতার পরিমাপ নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ ও প্রভিশনসংক্রান্ত সূচক উন্নত দেখানোর প্রবণতাও ভূমিকা রাখতে পারে। ঋণ আদায়ে আলোচনা ও সমঝোতা, ঋণ পুনর্গঠন, জামানত নগদায়ন, আইনি পদক্ষেপ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (এডিআর) কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এসব পদ্ধতির সাফল্য ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা এবং আইনগতভাবে পাওনা আদায়ের বাস্তবসম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋণ অনুমোদন ও সুশাসনের ক্ষেত্রে নীতিমালা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় ব্যবধান রয়েছে বলে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেছেন। এরপর রয়েছে ঋণ মূল্যায়ন এবং ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের পার্থক্য। এ ব্যবধান কমাতে ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের পরিচালক (গবেষণা, উন্নয়ন ও পরামর্শ) অধ্যাপক মো. শিহাব উদ্দিন খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক দলের সদস্য বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শহীদ উল্লাহ, বিআইবিএমের অধ্যাপক (সিলেকশন গ্রেড) মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সিদ্দিকী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. নুরুল আলম ও মো. রাসেল হাসান।

আলোচক হিসেবে অংশ নেন বিআইবিএমের সাবেক এ কে গঙ্গোপাধ্যায় চেয়ার অধ্যাপক এস. এ. চৌধুরী, বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ এবং পূবালী ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এশা। পরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদ। বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন এবং সমাপনী বক্তব্য দেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন