দলকে বিব্রত না করতেই প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত বলে দাবি; মাদকবিরোধী অভিযানে ৩০০ গ্রাম হেরোইনসহ অবৈধ সামগ্রী উদ্ধারের কথা জানালেন তিনি
অস্ত্র হাতে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ চালানো নিয়ে বিতর্কের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। এ বিতর্কের পেছনে কোনো রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্র দেখছেন না জানিয়ে তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর এক শীর্ষ নেতার মন্তব্যে তিনি ব্যথিত হয়েছেন।
সোমবার দুপুরে কয়েকশ নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন ইশরাক। তিনি দাবি করেন, দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না ফেলতেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জামায়াত নেতার বক্তব্যে ব্যথিত ইশরাক
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জানতে চান, কোনো রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন কি না ইশরাক।
জবাবে তিনি বলেন, “না, রাজনৈতিক দল থেকে ষড়যন্ত্রের শিকার হইনি, তবে আমি আমাদের আজকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতার মুখ থেকে একটা উক্তি শুনে আমি ব্যথিত হয়েছি। মানে উনি বলেছেন, ‘আমি সন্ত্রাস করছি অস্ত্র উঁচিয়ে’।”
নিজের অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ইশরাক বলেন, “তো মানে এটার আমি আর কীভাবে ব্যাখ্যা দেব যে দিনে দুপুরে আমি কী কাজে গিয়েছি, এখানে থানা পুলিশ ছিল, এত শত শত মানুষ ছিল। এখানে ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ, আরো অন্যান্য অনেক কিছু অবৈধ জিনিসপত্র উদ্ধার হয়েছে।”
অস্ত্র হাতে অভিযানের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক
শনিবার বিকেলে নিজের ফেসবুক পেজে গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেন ইশরাক হোসেন। একটি ভিডিওতে তাঁকে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
এসব ভিডিও প্রকাশের পর প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রোববার বিকেলে এক বিবৃতিতে সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশে মাদকের বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে বলে তাঁদের পর্যবেক্ষণ।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, “এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ অক্টোবর শনিবার বিকেলে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন গেন্ডারিয়া এলাকায় পিস্তল উঁচিয়ে যে দৃশ্যের অবতারণা করেছেন, তা ত্রাসের রাজত্বের বহিঃপ্রকাশ।”
দলকে বিব্রত না করতেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত
অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে ইশরাক হোসেন বলেন, দল যাতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না পড়ে, সে কারণেই তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমি তো জীবন বাজি রেখে গিয়েছি, এটা অনেকে বলে আমাকে যদিও আমি কেয়ার করি না, কারণ ছাদের ওপর থেকে গুলি করলে কার মাথায় পড়বে—উই ডোন্ট নো। তার পরেও যখন উনাদের মুখ থেকে সহযোগিতার আশ্বাসের বদলে এই ধরনের এক অ্যালিগেশন শুনি, তখন আমার কাছে মনে হয় যে আসলে আর তাকাব না ওইদিকে।”
অভিযান ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি সাধারণ মানুষের যে চাহিদা… আমি দেখেছি যে ওইদিন—সাধারণ মানুষ, এলাকাবাসী তারা হাততালি দিয়ে রীতিমত উল্লাস করেছে; অনেকদিন পর আমরা সাহস পেয়েছি, তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমি কাজ করে যাব।”
পদত্যাগের নির্দেশ নিয়ে আলোচনা
মাদকবিরোধী অভিযান ঘিরে বিতর্কের মধ্যে রোববার রাতে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ খবর শেয়ার করতে দেখা যায়।
তবে ইশরাক নিজেই রোববার সকালে ফেসবুক পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করেন। ওই পোস্টে কিছু মানুষের উল্লাস প্রকাশের বিষয়ে আক্ষেপ জানিয়ে তিনি লেখেন, “ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম।”
তিনি আরও লেখেন, “আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তাঁরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন।”

