শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডে কমবে মূল্যস্ফীতির চাপ ও দারিদ্র্য: বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ

দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাস এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আন্তর্জাতিক সংস্থা দুটির সঙ্গে আলোচনার বরাতে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপে পড়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো মানুষের দুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক হবে।

মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে ৮০ লাখ মানুষ

বিশ্বব্যাংকের হিসাবের কথা উল্লেখ করে ড. তিতুমীর জানান, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির প্রভাবে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।

এ অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমার সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে।

তাঁর মতে, এসব কর্মসূচি কেবল তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা এবং নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়া প্রতিরোধ করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত এসব কর্মসূচি সরকারের পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রকৃত উপকারভোগীদের সহায়তা

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, অতীতে অনেক প্রকৃত দরিদ্র মানুষ সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, সহায়তা পাওয়ার যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিরাও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

এ ধরনের অনিয়ম ও বৈষম্য দূর করতে সরকার ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

এর মাধ্যমে উপকারভোগীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা, সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির পাশাপাশি সংস্কারের তাগিদ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত ও সরকারি ব্যয়ের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে কর ফাঁকি, কর জালিয়াতি এবং বিশেষ সুবিধাভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান, গত অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

সরকারের নেওয়া সংস্কার কার্যক্রমের ফলেই রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ

ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়েও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান ড. তিতুমীর।

তিনি বলেন, অতীতের অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের কারণে ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কাজ করছে সরকার।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন। একই সঙ্গে নতুন করে আমানত জমা হওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

এ ছাড়া ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসাকে আর্থিক খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

জ্বালানি সংকটেও কৃষকদের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সারের আমদানি ব্যয় বেড়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের উৎপাদন খরচ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। তবে সরকার সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করছে।

বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সংকট সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা না থাকলেও দেশের মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

ড. তিতুমীর বলেন, নিজস্ব রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পূর্বাভাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শর্ত ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, সেটিও মূল্যায়নের অংশ।

তিনি দাবি করেন, অতীতে বিভিন্ন সংস্কার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে তা দূর করতে চায়।

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈঠক

এর আগে শুক্রবার সকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ব্যাংক অব আমেরিকার প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে।

বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককের কুইন সিরিকিত জাতীয় সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব কর্মসূচি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার কতটা কমাবে, তা নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি, সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নীতি এবং কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন