বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে ব্যক্তির মৃত্যু

দুই দফায় মারধরের অভিযোগ, হাসপাতালে হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা; পরিবারের দাবি, মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন শামীম

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যার আগে প্রথম দফায় মারধরের পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও রাতে বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানে গিয়ে আবারও মারধর করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের মৃত শামছুর রহমানের ছেলে। পরিবারের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং তার চিকিৎসা চলছিল।

দুই দফায় মারধরের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে দেবহাটার কুলিয়া এলাকায় শামীম প্রথম দফায় গণপিটুনির শিকার হন। খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

পরে রাত ৯টার দিকে কয়েক শ বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি মিছিল নিয়ে হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন শামীমকে আবারও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বিক্ষোভকারীরা সেখান থেকে চলে যান। পরে শামীমকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফেসবুক লাইভের পর উত্তেজনা

স্থানীয়দের ভাষ্য, শামীমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে ফজলুল হক আমিনী নামে এক ব্যক্তি ফেসবুকে লাইভ করেন। ওই লাইভে তিনি লোকজনকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর কুলিয়া এলাকায় গ্রাম্য চিকিৎসক সবুরের চেম্বারের সামনে বিক্ষুব্ধ লোকজন জড়ো হন। সেখানে চিকিৎসাধীন শামীমকে বের করে প্রথম দফায় মারধর করা হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।

ফজলুল হক আমিনী বলেন, শামীম গত ছয় মাস ধরে আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছিলেন। প্রতিবেশী বা অন্য কেউ তার সঙ্গে কথা বললে তিনি ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তা বলতেন বলেও দাবি করেন তিনি।

আমিনী আরও বলেন, ‘আজ তৌহিদী জনতা গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছে।’

তবে শামীম ঠিক কী মন্তব্য করেছিলেন, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি।

মানসিক অসুস্থতার কথা জানাল পরিবার

নিহতের ছোট ভাই সাগর হোসেন জানান, তারা পাঁচ ভাই এবং শামীম ছিলেন চতুর্থ। শামীম মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তার দুই সন্তান রয়েছে।

সাগর বলেন, পারিবারিক সমস্যার কারণে তার ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কখনো স্বাভাবিক আচরণ করলেও কখনো অস্বাভাবিক কথাবার্তা বলতেন। তার চিকিৎসাও চলছিল।

তিনি বলেন, ‘তিনি যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে আইনের মাধ্যমে তার বিচার হতে পারত। এভাবে পিটিয়ে তাকে মেরে ফেলা হলো কেন? আমরা কিছুই করতে পারিনি। সামনে এগোলে আমাদেরও মারধর করা হতো।’

সাগরের দাবি, দুই দিন আগে স্ত্রীর সঙ্গে শামীমের ঝগড়া হয়। ওই সময় তাদের কথাবার্তা আশপাশের কেউ রেকর্ড করে ছড়িয়ে দিয়েছেন বলে পরিবারের ধারণা। এতে লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

ঝগড়ার পর শামীম বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলেও জানান তার ভাই। পরে তাকে কুলিয়ার গ্রাম্য চিকিৎসক সবুরের চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। সেখানেই প্রথমে মারধর করা হয় এবং পরে হাসপাতালে গিয়ে আবারও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পুলিশের বক্তব্য

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ সন্ধ্যার আগে শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে রাত ৯টার দিকে কয়েক শ বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি মিছিল নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে তাকে আবারও মারধর করেন।

ওসি বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বিক্ষোভকারীরা চলে যান। পরে শামীমকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি আরও জানান, শত শত মানুষ জড়ো হয়ে সেখানে মব তৈরি করেছিল। বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগের কথা বলতে শুনেছেন তিনি। তবে ঠিক কী মন্তব্যের কারণে শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার বিষয়ে পরবর্তী তদন্তের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন