রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্বাচনের পরও শান্তি ফেরেনি মিয়ানমারে, ক্ষমতা সংহত করছেন মিন অং হ্লাইং

সেনাসমর্থিত সরকারের প্রেসিডেন্ট এখন সাবেক জান্তাপ্রধান • প্রতিরোধযুদ্ধ অব্যাহত, ম্যান্ডালে সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা • ASEAN-এ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক তৎপরতা • সংঘাতে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষ, রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিও সংকটাপন্ন

প্রান্তকাল ডেস্ক

সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছরের বেশি সময় পরও গভীর রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংকট থেকে বের হতে পারেনি মিয়ানমার। নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশটির সামরিক শাসনের কাঠামোয় আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন এলেও ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং। অন্যদিকে গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ বাহিনী ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতও থামেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে একদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে মিয়ানমারের সরকার, অন্যদিকে দেশের ভেতরে সামরিক বাহিনী ও প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

এর মধ্যেই মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ।

সেনাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এরপর দেশজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়।

পাঁচ বছর পর দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সেনাসমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (USDP) বড় জয় পায়।

তবে নির্বাচনটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। সমালোচক ও কয়েকটি পশ্চিমা সরকার নির্বাচনটিকে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ধরে রাখার প্রক্রিয়া হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এরপর গত ৩ এপ্রিল সেনাসমর্থিত পার্লামেন্টের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মিন অং হ্লাইং। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তিনি সেনাপ্রধানের পদ ছাড়েন।

পার্লামেন্টের ভোটে মিন অং হ্লাইং পান ৪২৯ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী নিও সো পান ১২৬ ভোট।

ফলে সামরিক পোশাক ছেড়ে বেসামরিক প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেও মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে মিন অং হ্লাইংই রয়েছেন।

থামেনি প্রতিরোধযুদ্ধ

নির্বাচন ও সরকার গঠনের পরও মিয়ানমারে সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ হয়নি।

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর গঠিত ছায়া সরকার ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (NUG) এবং এর সশস্ত্র শাখা পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (PDF) সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে একাধিক জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন।

সর্বশেষ ১১ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের প্রধান গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ গোষ্ঠী জানায়, তাদের বাহিনী ম্যান্ডালের তাদা-উ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কম্পাউন্ডে থাকা সামরিক বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

হামলার পর বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং প্রতিরোধ বাহিনীর দেওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

ঘটনাটি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও সশস্ত্র প্রতিরোধ এখনো সক্রিয়।

কিছু এলাকায় আবার এগিয়েছে সামরিক বাহিনী

যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিও গত কয়েক মাসে বদলেছে। Reuters-এর আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক বাহিনী কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুনর্দখল করেছে। একই সময়ে আঞ্চলিক কূটনৈতিক চাপের মধ্যে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনার একটি সীমিত সুযোগও তৈরি হয়েছে।

গণতন্ত্রপন্থী ও জাতিগত কয়েকটি গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত Steering Council for the Emergence of a Federal Democratic Union (SCEF) রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তবে তাদের অন্যতম শর্ত হচ্ছে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বন্ধ এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি।

মিন অং হ্লাইংয়ের সরকার এখনো SCEF-কে আনুষ্ঠানিক আলোচনার অংশীদার হিসেবে মেনে নেয়নি।

ফলে শান্তি আলোচনা নিয়ে তৎপরতা দেখা গেলেও একটি সর্বসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি।

ASEAN-এ ফেরার চেষ্টা

দেশের ভেতরে সংঘাত চললেও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং।

সর্বশেষ ১১ সেপ্টেম্বর তিনি দুই দিনের সফরে কম্বোডিয়ায় যান। সেখানে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত ও সিনেট প্রেসিডেন্ট হুন সেনসহ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন।

AP-এর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটি ছিল ASEAN-এর কোনো সদস্যরাষ্ট্রে মিন অং হ্লাইংয়ের চতুর্থ সফর।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সঙ্গে ASEAN-এর সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। জোটটির শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় দীর্ঘদিন ASEAN-এর শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের অংশগ্রহণ সীমিত রাখা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সফরগুলোকে ASEAN সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘আরও অবনতির দিকে’

রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষকে।

জাতিসংঘের Independent Investigative Mechanism for Myanmar গত ৭ সেপ্টেম্বর জানায়, দেশটির পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ আরও বেশি মাত্রায় সংঘটিত হচ্ছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সামরিক বাহিনী ক্রমবর্ধমানভাবে বিমান হামলার ওপর নির্ভর করছে এবং এসব হামলার প্রধান শিকার হচ্ছে বেসামরিক মানুষ। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় স্থাপনা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলেও হামলার ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে অন্তত ৮ হাজার ৭৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

মানবিক সংকট ভয়াবহ

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর OCHA জুলাইয়ে জানায়, মিয়ানমারে ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

দেশজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখে পৌঁছেছে। সংঘাতের কারণে অনেক পরিবারকে একাধিকবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে।

খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি ও অন্যান্য জরুরি সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও সংঘাত, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং প্রশাসনিক বাধার কারণে বহু এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক

মিয়ানমারের চলমান সংকটের সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি রোহিঙ্গা পরিস্থিতি।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রাখাইনে রোহিঙ্গারা এখনো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ, আটক ও বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ করেছে জাতিসংঘ।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের মুখে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে রাখাইনের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

কিন্তু মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তন, কিন্তু সংকটের অবসান নয়

২০২৬ সালে নির্বাচন, নতুন পার্লামেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন অং হ্লাইংয়ের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটেছে। একই সঙ্গে ASEAN সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে দেশটির নতুন সরকার।

কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি বলছে, রাজনৈতিক সংকটের অবসান এখনো হয়নি। সামরিক বাহিনী ও প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর লড়াই চলছে, শান্তি আলোচনার কাঠামো এখনো অনিশ্চিত এবং মানবিক পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে।

ফলে পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মিয়ানমারের সংকট এখন নতুন রাজনৈতিক কাঠামোয় প্রবেশ করলেও দেশটিতে স্থায়ী শান্তি ফেরার পথ এখনো স্পষ্ট নয়।

সূত্র: Reuters, Associated Press (AP), United Nations/OCHA ও Independent Investigative Mechanism for Myanmar; তথ্য হালনাগাদ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন