রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাব আল-মান্দেব ঘিরে নতুন যুদ্ধ, পাল্টাপাল্টি হামলায় সৌদি আরব-হুতি

কৌশলগত মাইয়ুন দ্বীপ হুতিদের দখলে • মখায় বিমান হামলা • সৌদির তেল স্থাপনায় ড্রোন-মিসাইল আঘাত • ঝুঁকিতে বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ

মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত ইরান যুদ্ধ এবার নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে ইয়েমেনে। লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা তীব্র হয়েছে। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মখা এবং প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত কৌশলগত মাইয়ুন বা পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে হুতিরা।

হুতিদের এ অগ্রগতির পর মখা এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতেও সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। সংঘাতের বিস্তার এমন একটি নৌপথকে ঝুঁকিতে ফেলেছে, যা ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর।

হুতিদের হাতে কৌশলগত দ্বীপ

ইয়েমেনের সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হুতি যোদ্ধারা প্রথমে মখা দখল করে পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণে অগ্রসর হয়। এরপর ধুবাবসহ সরকারনিয়ন্ত্রিত সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকাগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

শুক্রবার হুতি যোদ্ধারা বাব আল-মান্দেবের মাঝখানে অবস্থিত মাইয়ুন দ্বীপে পৌঁছায়। পেরিম নামেও পরিচিত এই দ্বীপটি প্রণালির দুই নৌচ্যানেলের মাঝখানে অবস্থিত। ফলে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ সামরিক ও বাণিজ্যিক—দুই দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হুতিদের এ অগ্রগতি বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

মখায় পাল্টা বিমান হামলা

হুতিদের দ্রুত অগ্রগতির পর মখা ও আশপাশের এলাকায় তাদের অবস্থান, যানবাহন ও অস্ত্র লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইয়েমেনের সরকারপন্থী বাহিনী।

এর আগে মখা বিমানবন্দরেও বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়। পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন স্থানে হুতি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

এই সংঘর্ষকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ইয়েমেনে সবচেয়ে গুরুতর সামরিক উত্তেজনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সৌদির জ্বালানি স্থাপনায় হামলা

যুদ্ধ শুধু ইয়েমেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক হুতি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক জ্বালানি স্থাপনা আক্রান্ত হয়েছে।

আবহা, জাজান, খামিস মুশাইত ও নাজরানসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার পর কয়েকটি স্থাপনায় সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। এসব হামলায় কয়েক ডজন মানুষ আহত হওয়ার কথাও জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

হুতিরা এসব হামলার দায় স্বীকার করে সৌদি জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে।

অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার পর সেটি বন্ধ করার কথাও জানিয়েছে সৌদি আরব। ফলে দেশটির তেল রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব

বাব আল-মান্দেব প্রণালি ইয়েমেনকে আফ্রিকার জিবুতি ও ইরিত্রিয়া থেকে পৃথক করেছে। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে।

এই পথ দিয়েই জাহাজ সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচল করে। ফলে প্রণালিতে বড় ধরনের সামরিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতে পারে।

এতে পরিবহন সময়, জাহাজের বীমা ব্যয় ও জ্বালানি খরচ বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেল ও পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।

হরমুজের পর এবার বাব আল-মান্দেব

বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে হরমুজের বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরমুখী রুটের গুরুত্ব বেড়েছিল।

এখন বাব আল-মান্দেবও বড় ধরনের সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পরিবহনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথই একসঙ্গে চাপের মুখে পড়েছে।

এই পরিস্থিতি ইরানের আঞ্চলিক মিত্র হুতিদের কৌশলগত গুরুত্বও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তেলের বাজারেও ধাক্কা

সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং বাব আল-মান্দেব ঘিরে উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে পড়েছে। সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হুতিরা যদি বাব আল-মান্দেবে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখতে পারে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইউরোপ ও এশিয়ার সরবরাহব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতেও এর ধাক্কা লাগতে পারে।

ইরান যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই স্তিমিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘর্ষ সেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে দিয়েছে।

ইরান-সমর্থিত হুতিদের পশ্চিম উপকূল দখলের অভিযান, সৌদি আরবে তাদের হামলা এবং পাল্টা বিমান অভিযান—সব মিলিয়ে ইয়েমেন আবারও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টে পরিণত হচ্ছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাব আল-মান্দেব দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক রাখা যাবে এবং সৌদি-হুতি সংঘাত আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয় কি না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন