বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জলবায়ু ঝুঁকিতে বিশ্বের অরক্ষিত বড় শহরগুলোর কাতারে ঢাকা-চট্টগ্রাম

আলফাজিওর জলবায়ু সহনশীলতা মূল্যায়ন

৭২ বড় শহরের বিশ্লেষণ; ঢাকার ভৌত জলবায়ু ঝুঁকি সর্বোচ্চ, অভিযোজনের পরও ঝুঁকি রয়ে গেছে উচ্চ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের তুলনামূলক কম সহনশীল বড় শহরগুলোর মধ্যে উঠে এসেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের নাম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভূস্থানিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আলফাজিওর ‘ক্লাইমেট রিস্ক অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইনডেক্স (CRRI)’ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

বিশ্বের ৭২টি বড় শহরের জলবায়ু ঝুঁকি ও সেই ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বিশ্লেষণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মূল্যায়নে শুধু কোনো শহর কতটা বন্যা, তাপপ্রবাহ বা অন্য প্রাকৃতিক বিপদের মুখে রয়েছে, তা দেখা হয়নি; বিদ্যমান অভিযোজন ব্যবস্থা ঝুঁকি কতটা কমাতে পারছে, সেটিও হিসাব করা হয়েছে।

আলফাজিওর মূল প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে আহমেদাবাদ ও পাকিস্তানের হায়দরাবাদের রেজিলিয়েন্স-অ্যাডজাস্টেড রিস্ক বা RAJ স্কোর ৪১। মুলতানের ৩৮ এবং ঢাকার ৩৬। কলকাতা ও লাহোরের স্কোর ৩৫।

স্কোর যত বেশি, অভিযোজন ব্যবস্থা বিবেচনায় নেওয়ার পরও অবশিষ্ট জলবায়ু ঝুঁকি তত বেশি। এই হিসাবে ঢাকা বিশ্বের উচ্চ অবশিষ্ট ঝুঁকির বড় শহরগুলোর প্রথম সারিতে রয়েছে।

ঢাকার ভৌত ঝুঁকি সর্বোচ্চ

মূল প্রতিবেদনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলোর একটি হলো—বিশ্লেষণ করা ৭২ শহরের মধ্যে ঢাকার ‘ফিজিক্যাল রিস্ক স্কোর’ সর্বোচ্চ।

ঢাকার ভৌত ঝুঁকির স্কোর ৬০। বিদ্যমান অভিযোজন সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার পর তা ২৪ পয়েন্ট কমে RAJ স্কোর দাঁড়িয়েছে ৩৬। অর্থাৎ অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা ঝুঁকি কিছুটা কমালেও ঢাকার অবশিষ্ট ঝুঁকি এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

আলফাজিও বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর উচ্চ ঝুঁকির পেছনে তাপজনিত ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ভৌত ঝুঁকির মাত্রার তুলনায় অভিযোজন সক্ষমতার প্রভাব তুলনামূলক সীমিত।

প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চট্টগ্রামকেও কম জলবায়ু সহনশীল বড় শহরগুলোর তালিকায় রাখা হয়েছে।

ছয় ধরনের জলবায়ু বিপদ বিবেচনা

আলফাজিওর CRRI পদ্ধতিতে ছয় ধরনের ভৌত জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো হলো—অভ্যন্তরীণ বন্যা, উপকূলীয় বন্যা, তাপজনিত চাপ, খরা, দাবানল এবং হারিকেনের বাতাস।

তবে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত স্কোর তৈরি করা হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামো ও অভিযোজন ব্যবস্থাও বিশ্লেষণে যুক্ত করা হয়েছে।

এর মধ্যে পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, প্রাকৃতিক বাফার, ভবনের শক্তি ও নির্মাণসামগ্রী, জলাধার ও বাঁধ, তাপ ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং নগর সবুজায়নের মতো বিষয় রয়েছে।

এ ছাড়া সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা নির্ধারণে জ্বালানি, সামাজিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অবকাঠামোর মান, পরিবেশ এবং শাসন কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন সূচক ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি।

শুধু ভৌগোলিক অবস্থানই নির্ধারক নয়

বিশ্লেষণটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, একই ধরনের প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখোমুখি দুটি শহরের প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা এক নাও হতে পারে। দুর্যোগ মোকাবিলায় অবকাঠামো, নীতি ও অভিযোজনমূলক বিনিয়োগ একটি শহরের অবশিষ্ট ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

আলফাজিওর হিসাবে প্রায় একই মাত্রার ভৌত ঝুঁকি থাকা শহরগুলোর RAJ স্কোরে সর্বোচ্চ ৩৩ পয়েন্ট পর্যন্ত ব্যবধান দেখা গেছে। অর্থাৎ জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিকল্পনা ও অভিযোজন সক্ষমতার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

শিকাগোর অবশিষ্ট ঝুঁকি সবচেয়ে কম

৭২ শহরের বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর RAJ স্কোর ৮, যা সবচেয়ে কম। এরপর আদ্দিস আবাবার স্কোর ১০ এবং মেলবোর্ন ও বার্সেলোনার ১১।

প্যারিস ও বুয়েনস এইরেসের স্কোর ১২ এবং নাইরোবি ও বোগোতার ১৩। আলফাজিওর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব শহরের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম প্রাথমিক ভৌত ঝুঁকি এবং অভিযোজন সক্ষমতা—দুই বিষয়ই ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে চীনের কয়েকটি বড় শহর উচ্চ অভিযোজন দক্ষতা দেখিয়েছে। বেইজিংয়ের অভিযোজন হার ৫০ শতাংশ, তিয়ানজিন ও শেনঝেনের ৪৯ শতাংশ এবং সাংহাইয়ের ৪৬ শতাংশ।

শহরের ভেতরেও ঝুঁকিতে পার্থক্য থাকতে পারে

তবে এই সূচকের সীমাবদ্ধতার কথাও স্পষ্ট করেছে আলফাজিও। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, স্কোরগুলো একটি শহরের গড় পরিস্থিতি তুলে ধরে। একই শহরের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়, এমনকি পাড়া বা সড়ক পর্যায়েও জলবায়ু ঝুঁকির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা হতে পারে।

ফলে ঢাকার RAJ স্কোর ৩৬ হওয়ার অর্থ রাজধানীর প্রতিটি এলাকার ঝুঁকি একই—এমন নয়। একইভাবে এ সূচককে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগ কখন বা কোথায় ঘটবে, তার পূর্বাভাস হিসেবেও দেখা উচিত নয়।

আলফাজিওর মূল্যায়ন মূলত ভৌত জলবায়ু ঝুঁকি এবং বিদ্যমান অভিযোজন সক্ষমতা একসঙ্গে বিবেচনা করে একটি শহরে কতটা ঝুঁকি অবশিষ্ট থাকছে, তার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে।

এই বিশ্লেষণে দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর অবস্থান বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আর ৭২ শহরের মধ্যে ঢাকার সর্বোচ্চ ভৌত ঝুঁকি স্কোর বাংলাদেশের রাজধানীর জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন