সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- নিজস্ব প্রতিবেদক
- ২ ঘণ্টা আগে
দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করতে নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে ধর্ম, বর্ণ কিংবা সংখ্যার ভিত্তিতে বিভাজনের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়কে সামনে রেখে একটি বৈষম্যহীন ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি পালন করে আসছেন। এই ঐতিহ্য ও সম্প্রীতি যাতে কোনো অপশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদার রাষ্ট্র। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবনযাপন করা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
এ প্রসঙ্গে তিনি সরকারের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর বদলে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়ের ওপর গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ‘সংখ্যালঘু’ ও ‘সংখ্যাগুরু’ পরিচয়ের পরিবর্তে অভিন্ন নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্বে কোনো ব্যক্তি এক দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও অন্য দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। ফলে সংখ্যাগত পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার, মর্যাদা ও দায়িত্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ যেন নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য বা বিভাজনের কারণ না হয়—এমন রাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর রাজনৈতিক দর্শনের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের সব নাগরিকের অভিন্ন ও গর্বের পরিচয়—‘আমরা বাংলাদেশী’।
‘দেশ পুনর্গঠনের পালা’
বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বিগত সময়ের শাসনব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ও কংসের পতনের ধর্মীয় উপাখ্যানের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনা টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত ছিল এবং আন্দোলন ও প্রাণহানির মধ্য দিয়ে সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটেছে।
তার ভাষায়, দেশে আবার গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে। এখন অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, প্রশাসনের বিভাজন দূর করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময়।
কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়তে চায় সরকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে দল-মত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকরা রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও রাষ্ট্রের প্রতি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং সংলাপের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
দেশের কোনো নাগরিক যাতে পিছিয়ে না থাকেন, সেটি নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এজন্য রাষ্ট্রের উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর
সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্পোর্টস কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ স্মরণ
জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মথুরায় শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। সে সময় মথুরার শাসক কংসের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার প্রতীক হয়ে ওঠেন শ্রীকৃষ্ণ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম আদর্শ—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সমাজে অন্যায় ও বিভেদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
দুর্গাপূজার আগাম শুভেচ্ছা
জন্মাষ্টমীর পাশাপাশি আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে উদযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছার পাশাপাশি দুর্গোৎসবের আগাম শুভেচ্ছাও জানান।
পুরোহিত ও সেবাইতদের সম্মানী প্রদান
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানের শুরুতে গীতা পাঠ করা হয়। সনাতন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের পুষ্পস্তবক প্রদান করেন, যা গ্রহণ করেন সংসদ সদস্য সূবর্ণা শিকদার ঠাকুর।
অনুষ্ঠানে নয়জন পুরোহিত ও সেবাইতের হাতে সম্মানী তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার পুরোহিত ও সেবাইতদের ব্যাংক হিসাবে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সম্মানীর অর্থ পাঠানো হয়।
অনুষ্ঠানে ছিলেন যারা
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীসহ সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, রাজনৈতিক নেতা এবং সনাতন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এ ছাড়া সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা এবং স্বামীবাগ ইসকনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
শুক্রবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ জন্মাষ্টমী। শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি উপলক্ষে উৎসবের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এই বিভাগের আরও খবর
গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেও ফ্যাসিস্টরা রক্ষা পায়নি: তথ্যমন্ত্রী
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও মামলা দিয়েও…
ট্রাইব্যুনালে নাশকতার শঙ্কা, নিরাপত্তা জোরদার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নাশকতার আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে…
দেশে ফিরে সংসদে আবেগাপ্লুত মির্জা আব্বাস
দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের…
স্থানীয় নির্বাচনে ভোটার স্থানান্তরের সুযোগ ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আবাসস্থল পরিবর্তনের…
সংশোধন হচ্ছে বিমান খাতের বিধিমালা, জোর দেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তা ও বিনিয়োগে
বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন…
আরও পড়ুন
একদিনে হাম-ডেঙ্গুতে ৭ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২ হাজার ২৯৬
দেশে একসঙ্গে বাড়ছে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা।…
সংশোধন হচ্ছে বিমান খাতের বিধিমালা, জোর দেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তা ও বিনিয়োগে
বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তা জোরদার করতে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। দীর্ঘ…
এআই জগতের ১০০ প্রভাবশালীর তালিকা প্রকাশ করল টাইম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারকারী ১০০ ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করেছে মার্কিন সাময়িকী টাইম। ‘টাইম১০০ এআই ২০২৬’ নামে প্রকাশিত…
তিন বছরে ৪০০ এর বেশি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়েছে: বাণিজ্যমন্ত্রী
২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে দেশে ৪০০-এর বেশি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী…
৭ মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের জিডি, উদ্ধার ১৩ হাজার ৬৭৯
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার জিডি হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে…
গণতন্ত্র , সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই: মমতা
বাংলার অস্তিত্ব বিপন্ন। শিক্ষা ও সংস্কৃতি ভূলুণ্ঠিত। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। পুলিশ দিয়ে বিরোধীদের ওপর জুলুম চালানো হচ্ছে। বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীদের…
পুরোনো ভূমি অধিগ্রহণ মামলার অব্যয়িত অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমার নির্দেশ
পুরোনো ভূমি অধিগ্রহণ মামলার আনুষঙ্গিক খাতের (ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন কন্টিনজেন্সি—এলএসি) অব্যবহৃত ও অব্যয়িত অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের সংযুক্ত…
৪১ ব্যাংকের সিএসআরের ২৭৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে হাসিনা-রেহানাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা
দেশের ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ এর নামে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার…

