বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চামড়া খাতে ইতালির বিনিয়োগ টানতে ‘তিন শহর মিশন’

মিলান-ফ্লোরেন্স-রোমে বিনিয়োগকারী খুঁজবে বাংলাদেশ • লক্ষ্য ইতালীয় প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব • সাভারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় কারখানার নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনা • আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনে জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

বাংলাদেশের চামড়া শিল্পে ইতালির বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তি আনতে এবার সরাসরি দেশটির শিল্প ও বিনিয়োগকেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। সম্ভাব্য সফরের লক্ষ্য শুধু নতুন বিনিয়োগকারী খোঁজা নয়; বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে আন্তর্জাতিক মান, পরিবেশসম্মত উৎপাদন এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনের দিকে এগিয়ে নিতে ইতালির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।

এ লক্ষ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সম্ভাব্য মিলান-ফ্লোরেন্স-রোম সফর নিয়ে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

মিলানে ব্যবসায়ী, ফ্লোরেন্সে চামড়া শিল্প, রোমে সরকার

প্রস্তাবিত সফরটি তিনটি পৃথক লক্ষ্য সামনে রেখে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন ইতালির রাষ্ট্রদূত।

মিলানে ইতালির ব্যবসায়ী সংগঠন ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক, ফ্লোরেন্সে টাসকানি অঞ্চলের বিশ্বখ্যাত চামড়া শিল্প এলাকা পরিদর্শন এবং রোমে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা—এই তিন ধাপে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে ইতালির ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সফরের মূল লক্ষ্য হবে নতুন ইতালীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ।

বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতকে ইতালীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে এর আগেও তুলে ধরেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। গত এপ্রিলে রাষ্ট্রদূত আলেসান্দ্রোর সঙ্গে বৈঠকে তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যসহ কয়েকটি খাতে ইতালীয় বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

বিনিয়োগের পথে বড় প্রশ্ন পরিবেশ ও সার্টিফিকেশন

বৈঠকে বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ—পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন—বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ইতালির রাষ্ট্রদূত মনে করেন, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন, পরিবেশসম্মত উৎপাদন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতিতে অগ্রগতি হলে বাংলাদেশ ও ইতালির কোম্পানিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্ব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্বের উচ্চমূল্যের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইতালীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি আকর্ষণের উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সাভারে বড় কারখানার নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা

আলোচনায় উঠে আসে সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বড় কারখানাগুলোকে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ছোট কারখানাগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা বজায় রাখার চিন্তা করা হচ্ছে।

শুধু বর্জ্য অপসারণ নয়, শিল্পবর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।

ফলে ইতালির সঙ্গে আলোচনায় বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তর, পরিচ্ছন্ন উৎপাদন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা—সবগুলো বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

লক্ষ্য শুধু কাঁচা চামড়া নয়, উচ্চ মূল্য সংযোজন

বাংলাদেশের চামড়া শিল্পে ইতালীয় অংশীদারত্ব বাড়লে এর সম্ভাব্য সুবিধা শুধু রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, পণ্যের নকশা ও মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক সংযোগ তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।

ইতালি বিশ্বজুড়ে চামড়া, জুতা ও উচ্চমানের ফ্যাশনপণ্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশেষ করে টাসকানি অঞ্চলের চামড়া শিল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদকদের সংযোগ তৈরির বিষয়টি সে কারণেই প্রস্তাবিত সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশ-ইতালি চেম্বার নিয়েও অগ্রগতি চায় দুই পক্ষ

দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়টিও বৈঠকে এসেছে। বাংলাদেশে ইতালি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত।

চেম্বারটি কার্যকর হলে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ, যৌথ উদ্যোগের অংশীদার খোঁজা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারে।

বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ-ইতালি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ এখন ইতালির সঙ্গে চামড়া খাতের সম্পর্ককে শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও যৌথ শিল্প উদ্যোগের অংশীদারত্বে নিয়ে যেতে চাইছে। প্রস্তাবিত তিন শহরের সফর বাস্তবায়িত হলে সেই লক্ষ্যেই ইতালির ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সরকারের কাছে বাংলাদেশের চামড়া খাতকে নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন