বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি সংকট কাটাতে পাঁচ দফা পরিকল্পনা সরকারের

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পাঁচ দফা সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সিসমিক জরিপ পরিচালনা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করা, প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ও বিডিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশে বর্তমান জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার সমন্বিতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

বাড়ানো হচ্ছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন

প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি কূপ খননের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস যুক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমানে আরও সাতটি কূপ খননের কাজ চলছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।

সিসমিক জরিপে জোর

দেশের অভ্যন্তরে নতুন গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে বড় পরিসরে সিসমিক জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গ্যাসের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করতে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

শক্তিশালী করা হচ্ছে বাপেক্স

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

বাপেক্সকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আরও দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নতুন রিগ যুক্ত হলে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

অফশোর-অনশোর অনুসন্ধানে পিএসসি ও বিডিং

সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারে পিএসসি ও বিডিং কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, অফশোর ও অনশোর এলাকায় অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাড়ানো হবে এলএনজি অবকাঠামো

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোমে গভীর সমুদ্রে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, টার্মিনালটি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রিগ্যাসিফাইড এলএনজি বা গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি দৈনিক আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব টার্মিনাল স্থাপন করা হলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

সমন্বিত উদ্যোগে জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্য

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সমুদ্র ও স্থলভাগে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে অনুসন্ধান এবং এলএনজি আমদানি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ—সবগুলো উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সরকারের এসব কর্মপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার চাপ কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এর আগে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য নির্ধারিত ছিল।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন