সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

জামালপুরে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ে চালক হত্যা, ৮ বছর পর গ্রেপ্তার ৩

জামালপুরের ইসলামপুরে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক হত্যা মামলার প্রায় আট বছর পর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিন পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—ইসলামপুর উপজেলার আগুনের চর এলাকার মো. জালাল মিয়া (৪২), মো. নুর ইসলাম (৩২) ও মো. মোজাম্মেল হক (৪৮)।

সিআইডি জানায়, জামালপুর ইউনিটের একটি দল গত ২৬ আগস্ট ইসলামপুর থানার নাপিতের চর এলাকা থেকে জালাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ২৭ আগস্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকা থেকে নুর ইসলাম এবং গাজীপুর কলেজ রোড এলাকা থেকে মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডির তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ২ জুলাই দুপুরে ভুক্তভোগী তার স্ত্রী মোছা. তাহমিনা বেগমের সঙ্গে খাবার খেয়ে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল নিয়ে বকশীগঞ্জ বাজারের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। রাতে বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন। পরে ইসলামপুর থানার চুংরাপাড়া এলাকার পুবেরবন্দ এলাকায় একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্ত্রী মরদেহটি তার স্বামী হিসেবে শনাক্ত করেন।

তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, ওই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র পূর্বপরিকল্পিতভাবে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ভুক্তভোগীকে কৌশলে ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। সেখানে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করে মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায় বলে তদন্তে উঠে আসে।

এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে ২০১৮ সালের ৩ জুলাই ইসলামপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে ইসলামপুর থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট মামলাটির তদন্তভার সিআইডি গ্রহণ করে।

সিআইডি জানায়, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় মামলাটির তদন্তে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে আসামিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ায় গোয়েন্দা কৌশলসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে তদন্ত চালিয়ে যায় সংস্থাটি।

তদন্তের একপর্যায়ে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে ভুক্তভোগীর মোটরসাইকেলে থাকা তিন অজ্ঞাত ব্যক্তির ছবি সংগ্রহ করা হয়। তাদের শনাক্ত করতে জামালপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান, হাট-বাজার ও জনসমাগমস্থলে প্রায় পাঁচ হাজার পোস্টার লাগানো হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে তাদের ছবি প্রচার করে তথ্যদাতার জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

সিআইডির দাবি, এ প্রচারণার মাধ্যমে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজনদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জালাল মিয়া, নুর ইসলাম ও মোজাম্মেল হকের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হয় সিআইডি।

এরপর একাধিক অভিযান চালিয়ে প্রথমে জালাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে জালাল হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং অপর দুই আসামির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তার দেওয়া তথ্য ও তদন্তে প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে নুর ইসলাম ও মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডি আরও জানায়, গ্রেপ্তারের পর তিন আসামি আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে তাদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি লিপিবদ্ধের জন্য আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালতে তারা স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিয়েছেন এবং সেখানে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেল সম্পর্কেও তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।

প্রায় আট বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা মামলাটির তদন্তে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, ফরেনসিক যাচাই ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

গ্রেপ্তার তিন আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন