রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

ফুলবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচ মাসে ৩৬৫ শিশুর জন্ম, স্বাভাবিক প্রসবে বাড়ছে মায়েদের আস্থা

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, দক্ষ চিকিৎসক ও মিডওয়াইফদের সেবা এবং বিনামূল্যে নিরাপদ প্রসব সুবিধার কারণে দিন দিন আরও বেশি গর্ভবতী মা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সমুখী হচ্ছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মোট ৩৬৫টি শিশুর জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৭টি শিশুর জন্ম হয়েছে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে এবং ১৮টি শিশুর জন্ম হয়েছে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে। এ হিসেবে মোট প্রসবের প্রায় ৯৫ শতাংশই স্বাভাবিক প্রসব, যা সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরছে।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ৮৫টি প্রসবের মধ্যে ৮১টি ছিল স্বাভাবিক এবং ৪টি সিজারিয়ান। ফেব্রুয়ারিতে ৭৩টি প্রসবের মধ্যে ৬৯টি স্বাভাবিক ও ৪টি সিজারিয়ান, মার্চে ৬৭টির মধ্যে ৬৪টি স্বাভাবিক ও ৩টি সিজারিয়ান, এপ্রিলে ৬৫টির মধ্যে ৬১টি স্বাভাবিক ও ৪টি সিজারিয়ান এবং মে মাসে ৭৫টি প্রসবের মধ্যে ৭২টি স্বাভাবিক ও ৩টি সিজারিয়ান পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রসব-পরবর্তী সময়ে নবজাতক ও প্রসূতি মা উভয়ের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং বর্তমানে পাঁচ মাসে জন্ম নেওয়া সব নবজাতক ও তাদের মায়েরা সুস্থ রয়েছেন। এছাড়া জন্মের পরপরই নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় সনদ প্রদান করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য সরকারি সেবাগ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী একাধিক মা জানান, স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে শুরুতে তাদের মধ্যে নানা ধরনের ভয় ও শঙ্কা থাকলেও চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফদের নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং আন্তরিক সহযোগিতার কারণে নিরাপদভাবে সন্তান জন্মদান সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এ সেবা পাওয়ায় তাদের আর্থিক চাপও কমেছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমিয়ে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করার জন্য সরকার দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। গর্ভাবস্থার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ শনাক্তকরণ এবং প্রসবকালীন দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়ছে। যেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব নয় বা মা ও শিশুর ঝুঁকি থাকে, কেবল সেসব ক্ষেত্রেই সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. সাজেদুল ইসলাম সাজু বলেন, মাতৃ ও নবজাতকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাইনি বিশেষজ্ঞ, মিডওয়াইফ, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় সেবা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের পদ শূন্য রয়েছে। এ কারণে পাশের উপজেলা থেকে একজন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সপ্তাহে নির্দিষ্ট দুই দিন এসে সিজারিয়ান কার্যক্রমে সহায়তা করছেন। তবে স্থায়ীভাবে এ পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে প্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেবা আরও বিস্তৃতভাবে প্রদান করা সম্ভব হবে।

এদিকে সম্প্রতি কর্মরত গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বদলির কারণে ভবিষ্যতে সিজারিয়ান সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও শূন্য পদ পূরণ করা গেলে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী হবে এবং নিরাপদ প্রসবসেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন কমিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করা মা ও নবজাতক উভয়ের জন্যই অধিক উপকারী। ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন