রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

তুরাগ নদীতে বস্তাবন্দী লাশের রহস্য উদ্ঘাটন: হানিট্র্যাপ চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত গাড়ি উদ্ধার

ঢাকার তুরাগ নদীতে উদ্ধার হওয়া বস্তাবন্দী অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় শনাক্তসহ চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা মেট্রো (উত্তর)। এ ঘটনায় কথিত হানিট্র্যাপ ও মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি নিহতের লুণ্ঠিত প্রাইভেটকার উদ্ধার এবং প্রধান আসামির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণখান থানার মামলা নং-০১, তারিখ ২ জুন ২০২৬, ধারা ৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোডের তদন্তে এই সাফল্য আসে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহত মো. লোকমান সরদার (৩৮) পেশায় একজন চালক ছিলেন। তিনি ইনড্রাইভ ও পাঠাও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ভাড়ায় প্রাইভেটকার চালাতেন। গত ৩০ মে ২০২৬ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি কুড়িলের বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হন। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বাসায় ফিরে না আসায় তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি চালান।

একপর্যায়ে গৌরনদী থানা পুলিশ নিহতের ভাইকে জানায়, দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদীতে প্লাস্টিকের বস্তাবন্দী অবস্থায় একটি লাশ পাওয়া গেছে। পরে সেটি লোকমান সরদারের মরদেহ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। কাঁধ থেকে হাতের আঙুল পর্যন্ত চামড়া উঠে যাওয়া, হাত-পা ভাঙাসহ নির্মম নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়। পরে নিহতের স্ত্রী অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পিবিআই জানায়, ঘটনার পর থেকেই তারা ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, চক্রের সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ওরফে আনিবা জারা পরিকল্পিতভাবে লোকমানকে টঙ্গীর পাখির বাজার এলাকায় ডেকে নেন। সেখানে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সালমান, আদিব ইসলাম, সবুজ মিয়া, রাকিবসহ আরও কয়েকজন তাকে আটক করে মারধর করে। পরে মাদক সেবনের অভিযোগে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। নির্যাতনে গুরুতর আহত হওয়ার পর হাত-পা বেঁধে তাকে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকার নিয়ে আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায়।

মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। তদন্তের অংশ হিসেবে ঢাকা, গাজীপুর ও কক্সবাজারে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকা থেকে আদিব ইসলাম, ঢাকার খিলক্ষেতের পূর্ব নামাপাড়া এলাকা থেকে সালমান ও মীম এবং গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিমের পাখির বাজার এলাকা থেকে সবুজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পিবিআই আরও জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৪ জুন গাজীপুরের গাছা থানা এলাকার পশ্চিম ঝাঝর উত্তর খাইলকৈর এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন অবস্থায় নিহতের লুণ্ঠিত প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়। পরে গাড়িটির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর যাচাই করে মালিকানা নিশ্চিত করা হয়।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি কথিত স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে তরুণ, শিক্ষার্থী, চালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে ফাঁদে ফেলত। নারী সদস্যদের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন বা মাদক সেবনের প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের ডেকে এনে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও সর্বস্ব লুটে নেওয়া হতো।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামি এস এম সালমান আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও কয়েকজনের নামও প্রকাশ করেছেন। পিবিআই জানিয়েছে, পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, বিকাশে টাকা লেনদেনের প্রমাণপত্র এবং নিহতের লুণ্ঠিত প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে।

পিবিআই সকলকে হানিট্র্যাপ ও অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক চক্র সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন