অনুসরণ করুন:
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় পর্যটনে ধাক্কা, ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকায় বাড়ছে ভ্রমণকারীর চাপ

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে অঞ্চলটির বিভিন্ন জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার তুলনামূলক নিরাপদ দেশগুলোতে পর্যটকের চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

বার্তা সংস্থা এএফপি ও ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া অস্থিরতার পর থেকে জর্ডান, তিউনিসিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত অনেক গন্তব্যে পর্যটন খাত বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে।

জর্ডানের ঐতিহাসিক নগরী পেত্রায় বিদেশি পর্যটকদের দীর্ঘ সারি এখন অনেকটাই কমে গেছে। পর্যটন অপারেটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীরা মধ্যপ্রাচ্য সফর এড়িয়ে চলছেন।

অন্যদিকে তিউনিসিয়ার পর্যটন খাতেও গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের শুরুটা প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতির। তিউনিসিয়ার জেরবা দ্বীপের রয়্যাল গার্ডেন প্যালেস হোটেলের ব্যবস্থাপক আনোয়ার কামুন এএফপিকে বলেন, “সাধারণত আমরা প্রতিদিন প্রায় ১০০টি নতুন বুকিং পেতাম। এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৫০টিতে।”

বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমানবন্দর ও আকাশপথে বিধিনিষেধ, ফ্লাইট ব্যাহত হওয়া এবং জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিমানভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় পর্যটকেরা দূরপাল্লার গন্তব্যে ভ্রমণে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন।

থাইল্যান্ডের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ইউরোপীয় পর্যটকের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশটিতে জার্মান পর্যটকের সংখ্যা ২৯ শতাংশ এবং ইতালীয় পর্যটকের সংখ্যা ৪৪ শতাংশ কমেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ট্যুর অপারেটর জার্মানিভিত্তিক টিইউআই গ্রুপও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেন্দ্র করে “ভ্রমণকারীদের সতর্ক মনোভাবের” কথা উল্লেখ করে তাদের মুনাফার পূর্বাভাস কমিয়েছে।

এদিকে পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বলছে, বৈশ্বিক ভ্রমণ প্রবণতার এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে যাচ্ছে ইউরোপ। নিরাপদ ও সহজে যাতায়াতযোগ্য গন্তব্য হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন পর্যটকদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ইউরোপজুড়ে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় ৭ দশমিক ১ শতাংশ বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশি।

বিশেষ করে দক্ষিণ ইউরোপের ইতালি ও স্পেন সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্পেনের এক ব্যবসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক রাফায়েল পাম্পিলন ওলমেদো বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক পর্যটনের গতিপথ বদলে দিচ্ছে। নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত গন্তব্যগুলোতে চাহিদা বাড়ছে।”

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, তুরস্ক, গ্রিস কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলের কাছাকাছি দেশগুলোতে যেতে অনাগ্রহী অনেক ইউরোপীয় পর্যটক এখন স্পেন ও পর্তুগালকে বেছে নিচ্ছেন।

স্পেনের ইএসএডিই বিজনেস স্কুলের অর্থনীতিবিদ পেদ্রো আজনার এই পরিবর্তনকে “সাবস্টিটিউশন ইফেক্ট” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, “সংঘাতের কারণে অনেক পরিবার তাদের ছুটির গন্তব্য বদলে ফেলছে অথবা ভ্রমণ ব্যয় কমিয়ে আনছে।”

অন্যদিকে ইউরোপের কাছাকাছি হওয়ায় উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোও বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। রাজধানী রাবাতের বেলিমা রেসিডেন্সের অপারেশনস ম্যানেজার জাকারিয়া মেলিয়ানি জানান, এবার পর্যটন মৌসুম স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, “সাধারণত এখানে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে পর্যটন মৌসুম শুরু হয়। কিন্তু এ বছর রমজানের পরপরই পর্যটকের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। যারা উপসাগরীয় অঞ্চল বা এশিয়ায় ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা এখন মরক্কো বেছে নিচ্ছেন।”

মরক্কোর পর্যটনমন্ত্রী ফাতিম-জাহরা আম্মোর জানান, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও দেশটির পর্যটন খাত প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোচ্ছে। তার ভাষ্য, ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ নাগাদ মরক্কোর পর্যটন খাতে প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই পরিবর্তন আবারও প্রমাণ করেছে যে বৈশ্বিক পর্যটন শিল্প ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে ইউরোপীয় ভ্রমণকারীরা এখন তুলনামূলক স্বল্প দূরত্বের ও নিরাপদ গন্তব্যের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন